২০২০ সালের ২ আগস্ট। সিলেটের জকিগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আনোয়ার হোসেন মুন্না (২৮) নামে এক যুবক নিহত হন। পরদিন সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পুলিশ জানায়, ‘মুন্নাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে গেলে দুর্বৃত্তরা গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালালে সেখানে মুন্নার লাশ পাওয়া যায়।’ যদিও মুন্নার মৃত্যুর ঘটনাটি পুলিশের ‘সাজানো নাটক’ দাবি করে তার মা রুবি বেগম ঘটনার পর থেকে প্রতিকার চেয়ে আসছিলেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর গণশুনানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েক দফায় গণশুনানির আয়োজনের বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়। কিন্তু পুলিশ, মাদক কারবারিদের প্রভাবে স্থানীয় প্রশাসন গণশুনানি না করে ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়। সেই ঘটনার চার বছর পর জকিগঞ্জ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) তিনজনের বিরুদ্ধে মুন্নার মা আদালতে হত্যা মামলা করেছেন।
গত মঙ্গলবার জকিগঞ্জ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই মামলা করা হয়েছে। গতকাল বুধবার যোগাযোগ করলে জকিগঞ্জ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আইনজীবী কাওছার রশিদ বাহার মামলাটি নথিভুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে ঘটনার সময় জকিগঞ্জ থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দায়িত্বে থাকা মীর মো. আব্দুন নাসেরকে। অন্য দুই আসামি হলেন, জকিগঞ্জের সীমান্তবর্তী সুলতানপুর ইউনিয়নের সাবেক সদস্য ও সুলতানপুর গ্রামের তাজ উদ্দিন তাজন ও আলমনগর গ্রামের জামাল আহমদ। মীর নাসের ৫ আগস্টের পর সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ থাকায় সম্প্রতি তাকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। মামলার বিষয়ে তার মোবাইলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০২০ সালের ২ আগস্ট দুপুরে আনোয়ার হোসেন মুন্নাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আসামিরা থানায় আটক রাখেন। ওই দিন রাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়।
মামলার এজাহারে মুন্নার মা রুবি বেগম উল্লেখ করেন, তার স্বামী মারা যাওয়ার পর একমাত্র ছেলে আনোয়ার হোসেন মুন্না পরিবারের হাল ধরেন। একপর্যায়ে অভিযুক্ত মাদক কারবারি তাজন উদ্দিনের কুপরামর্শে মুন্না মাদকের বাহকের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। ২০২০ সালে মাদক বহনের কাজ ছেড়ে দিতে চাইলে তার ওপর মাদক কারবারিরা ক্ষিপ্ত হয়। জকিগঞ্জ থানার তৎকালীন ওসি ও মাদক কারবারিরা তার ছেলেকে হত্যার পরিকল্পনা করে। ২০২০ সালের ২ আগস্ট দুপুরে মুন্নাকে পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে যায়। ওইদিন রাতে অজরপাড়া গ্রামে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়।
‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের পর জেলা পুলিশ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিল, মাদক চোরাচালান ও বিভিন্ন মামলায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি আনোয়ারকে ২ আগষ্ট রাতে আটক করা হয়। রাতেই তাকে নিয়ে মাদক ও অস্ত্র উদ্ধারের জন্য অভিযান চালায় পুলিশ। দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে সুলতানপুরের অজোগ্রামে অভিযানকালে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। এ সময় পুলিশও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে আনোয়ারকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে জকিগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনাটি পুলিশ ও মাদক কারবারিদের সাজানো নাটক দাবি করে ১৯ আগস্ট নিহত মুন্নার মা রুবি বেগম ডাকযোগে পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) দপ্তর, মানবাধিকার সংস্থাসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। এ অভিযোগটি নিয়ে তিনি পরবর্তী সময়ে একটি সংবাদ সম্মেলনও করেন।
লিখিত বক্তৃতায় রুবি বেগম তখন দাবি করেছিলেন, ‘জকিগঞ্জের ঘটনাটি পুলিশ কর্তৃক বাংলাদেশে সর্বশেষ বন্দুকযুদ্ধ।’
তিনি উল্লেখ করেছিলেন, সীমান্ত এলাকায় পণ্য পরিবহনে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতেন তার ছেলে মুন্না। এ কাজ করতে গিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য তাজউদ্দিনের মাধ্যমে তিনি মাদক চোরাচালানের বাহকের কাজে জড়িয়ে পড়েন। এ কারণে জকিগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। কিন্তু তাজউদ্দিনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। বিষয়টি জেনে মুন্নাকে বুঝিয়ে ফেব্রুয়ারি মাস (২০২০) থেকে মাদক চোরাচালানের কাজ থেকে বিরত রাখেন রুবি। আগের মতো মুন্না কাজে যাচ্ছেন না দেখে তাজউদ্দিন একাধিকবার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন মুন্না আর কাজ করবেন না বলে তাজউদ্দিনকে সাফ জানিয়ে দেন। এ কারণে তাজউদ্দিন ক্ষুব্ধ হন। ২ আগষ্ট জকিগঞ্জ থানা–পুলিশের একটি দল দুপুরের দিকে বাড়ি থেকে আনোয়ারকে ধরে নিয়ে যায়। সন্ধ্যার দিকে রুবি থানায় গিয়ে তাজউদ্দিনকে জকিগঞ্জ থানার ওসি মীর মো. আবদুন নাসেরের সঙ্গে দেখতে পান। পরদিন ভোরে বন্দুকযুদ্ধে নিহতের খবর পান।
জকিগঞ্জ থানায় মুন্নাকে আটক করে রাখার একটি ছবিও লিখিত অভিযোগের সঙ্গে দাখিল করা হয়েছিল।
পুলিশ ও প্রশাসন সূত্র জানায়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগ ও বন্দুকযুদ্ধে নিহতের সর্বশেষ ঘটনা হওয়ায় পুলিশ স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে তদন্ত করতে এলাকায় গণশুনানির আয়োজন করেছিল। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে গণশুনানির জন্য জকিগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিজ্ঞপ্তিও জারি করেছিলেন। কিন্তু জকিগঞ্জ থানা পুলিশের প্রভাবে সহকারী কমিশনার গণশুনানি গ্রহণে কালক্ষেপণ করেন।
উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, তিন দফা বিজ্ঞপ্তি দিয়েও সহকারী কমিশনার গণশুনানি করেননি। এক পর্যায়ে তিনি বদলি হলে বিষয়টি থামচাপা পড়ে থাকে।
এত দিন পর ছেলে হত্যার বিচার চাওয়ার বিষয়ে রুবি বেগম জানান, তিনি ঘটনার পর থেকে এটাকে বন্দুকযুদ্ধের সাজানো নাটক বলে আসছিলেন। কিন্তু কেউ শুনছিলেন না। কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে মেজর (অব.) সিনহা নিহতের ঘটনার পর সাহস করে তিনি বিচার দাবি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। সেটিও চাপা পড়ায় এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি আইনজীবীদের পরামর্শে মামলা করেছেন।
রুবি বেগম বলেন, ‘হেই ঘটনার (সিনহা হত্যা) মতো আমার ঘটনা না অইলেও মায়ের কোলটাও একই রকম খালি অইছে। বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমার শান্তি নাই।’
রুবি জানান, নিহত আনোয়ার হোসেন মুন্নার বয়স যখন ৫ বছর, তখন রুবির স্বামী সিদ্দেক আলী মারা যান। ১০ বছর বয়স থেকে শ্রমিকের কাজ করে মুন্না সংসার চালাচ্ছিলেন। মুন্নার এক ছেলেসহ তিন সন্তান ও স্ত্রী রয়েছে।




















