এসএমপির ট্রাফিক অফিসে বিশৃঙ্খলা, সড়কে নেই শৃঙ্খলা

  • প্রকাশের সময় : ১৪/০১/২০২৫ ০৭:৫৮:৪৪ AM

Share
105

পর্যটন নগরী সিলেট এখন যানজটের নগরী। যানজটের প্রধান কারণ সড়ক সংকোচিত হওয়া। সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সড়ক প্রশস্ত করার পরও যানজট কমেনি বরং দিনদিন বাড়ছে। শহরের যানজট না কমার কারণ হিসেবে সিএনজি অটোরিকশা, হকার ও ট্রাফিকপুলিশকে দায়ী করছেন নগরবাসী। 

নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও সড়ক অর্ধেক দখল করে শতাধিক সিএনজি অটোরিকশার স্ট্যান্ড গড়ে ওঠা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি হকাররা তাদের নির্ধারিত স্থান ছেঁড়ে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে রেখেছে অর্থের বিনিময়ে। সড়ক প্রশস্ত রেখে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা যাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য তারা নীতি এবং লজ্জাশরম বিসর্জন দিয়ে হারাম উপার্জনে মনোযোগ দিয়ে কলমে কাগজে নিষ্ঠার সাথে কাজ করছেন। 

সিলেট মেট্রোপলিটনের ৬টি থানা এলাকা টিআইদের মধ্যে ভাগ করে দায়িত্ব বণ্টন করে দেয়া আছে। জনগণের সেবক গুণধর টিআইরা নিজেদের পৈত্তিক সম্পত্তি মনে করে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও সড়ক মাসিক চুক্তিতে হকার এবং সিএনজি নেতাদের কাছে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। আর সেকারণে চুক্তির আওতাধীন যানবাহনে অবৈধ পার্কিং এর মামলা দেয়ার কোনো রেওয়াজ নেই। একই অবস্থা ফুটপাত দখলকারী ব্যবসায়ীদের বেলায়ও। টিআই থেকে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই সার্জেন্টরা। অধিকাংশ সার্জেন্টদের সাথে ত্রুটিপূর্ণ ও বৈধ কাগজপত্রবিহীন যানবাহন মালিক, চালকদের সাথে সাপ্তাহিক ও মাসিক চুক্তি থাকায় সে সব যানবাহন কখনো মামলা বা রেকার হয় না। একাধিক শ্রমিকনেতার দাবী- মাঠ পর্যায়ের অফিসারদের ম্যানেজ না করে অবৈধ কোনো যানবাহন সড়কে চলাচল করা কখনো সম্ভব না। 

নগর এবং শহরতলীতে চলাচলকারী বৈধ কাগজপত্রবিহীন টেম্পো, লেগুনা, টমটম, পিকআপ, ট্রাক, বাস ও কার-লাইটেস, চোরাই, ডাবল নাম্বারের যানবাহন এবং অনটেস্ট সিএনজি (পুলিশের ভাষায় রোহিঙ্গা গাড়ি) চলাচল করে টিআই, সার্জেন্ট, টিএসআই, এটিএসআই এর সাথে মাসিক চুক্তির মাধ্যমে। একটি সূত্র মতে, নগর ও শহরতলীতে চলাচল করছে সাত হাজার অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা, সাড়ে তিন হাজার মিশুক ও টমটম, আড়াই হাজার পিকআপসহ অন্যান্য যানবাহন। আর বার হাজার অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত চার্জিং রিকশা শহরের অলিগলিতে চলছে। 

নগরীতে প্রতিদিন চলা চেকপয়েন্টে চুক্তির আওতাধীন কোনো যানবাহন আটক হলে চালক চুক্তি হওয়া অফিসারকে ফোন দিয়ে কথা বলালে সে গাড়ি ছেড়ে দেয়া হয়। বিষয়টি ট্রাফিক অফিস জেনে গেলে বিএনপি বা জামায়াত নেতার গাড়ি বলে চালিয়ে দেয়া হয়। এদিকে, যানজট নিরসনের অজুহাতে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সিটি কর্পোরেশনকে অপব্যাখ্যা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সিএনজি ও লেগুনা শ্রমিকনেতাদের পরামর্শে ট্রাফিক বিভাগ বিভিন্ন সড়কের মধ্যখানে বাঁশ বেঁধে রেখেছে। সে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠছে নতুন নতুণ সিএনজি স্ট্যান্ড। 

ওসমানী শিশু পার্ক সংলগ্ন লেগুনা স্ট্যান্ডের সামনের সড়কের মধ্যভাগে, বন্দরের জিসি স্কুলের সামন, সিটি সুপার মার্কেটের প্রবেশ পথে, কুদরত উল্লাহ মার্কেটের সামনের সড়কে বাঁশ বেঁধে দেয়ায় সিএনজি অটোরিকশার নতুন স্ট্যান্ডের বৈধতা পেয়েছে চালক ও হকাররা। কাজিরবাজার ব্রিজের দুইপ্রান্ত ও মধ্যবর্তী স্থানে সিএনজির নতুন স্ট্যান্ড করেছে চালকরা। ঝুঁকিপূর্ণের কারণ দেখিয়ে রিকশা চলাচল বন্ধ রাখা ক্বিনব্রীজ এখন নিত্যপণ্যের বাজার। সড়ক দখলকারীদের বিরুদ্ধে ট্রাফিকপুলিশের মামলা দেয়ার আইন থাকলেও চাঁদাবাজিতে ভাটা পড়ার কারনে পুলিশ মূলত অ্যাকশনে যায়না। পক্ষান্তরে সড়ক দখলমুক্ত রাখতে না পারার যুক্তি হিসেবে লোকবল সংকটসহ নানান খুঁড়া যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। 

পুলিশ চাইলে মুহূর্তের মধ্যে সড়ক থেকে অবৈধ স্ট্যান্ড সরাতে যে পারে তার প্রমাণ সম্প্রতি মিলেছে। ডিসেম্বরের মধ্যভাগে সিটি কর্পোরেশনের প্রধান গেটের সম্মুখের সড়ক দখলকারী সিএনজি অটোরিকশা চালকদের সাথে সার্জেন্ট আশীষ নেহরার ঝামেলা বাঁধে। সড়ক দখল করে যানজট সৃষ্টির দায়ে সব চালককে রং পার্কিং এর মামলা দেয়ার কঠোর হুঁশিয়ারি দেন কর্তব্যরত সার্জেন্ট। তার হুংকারে সড়ক থেকে চালকরা সিএনজি অটোরিকশা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়। আশীষের কঠোর নজরদারির কারনে টানা তিনদিন সিসিক ফটকের সামনের স্ট্যান্ডে কোনো সিএনজি দাঁড়াতে দেখা যায়নি। আর এতে প্রমাণ হয় পুলিশ চাইলে অসম্ভবও সম্ভব করতে পারে। শহরবাসীর স্বার্থে সিলেটের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের সাথে নিয়ে নগরী দখলমুক্ত করা যেতে পারতো বলে সচেতন মহল মনে করে। 

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, অনটেস্ট, চোরাইকৃত সিএনজির পাশাপাশি এক গাড়ির নাম্বারে একাধিক সিএনজি অটোরিকশা শহরের প্রবেশমুখ থেকে বিভিন্ন সড়কে চলাচল করে থানা ও ট্রাফিকপুলিশকে ম্যানেজ করে। ক্বিনব্রীজ থেকে চন্ডিপুল এলাকার দায়িত্বে রয়েছেন টিআই নূরে আলম। এ রোডে সবচেয়ে বেশি অনটেস্ট ও চুরাইকৃত সিএনজি সড়কে চলাচল করে। ট্রাফিক অফিস, টিআই, দক্ষিণ সুরমার কয়েকটি থানা ও রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করে আসছে আলতাব নামের এক শ্রমিক নেতা। 

এভাবে আম্বরখানা থেকে এয়ারপোর্টের দায়িত্বে রুহুল আমিন, সুবিদবাজার থেকে তেমুখীর দায়িত্বে বিভাস চক্রবর্তী, হুমায়ুন রশিদ চত্বর এলাকায় মোশারফসহ অন্যান্যরা গণঅভ্যুত্থানের পরও চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন। চাঁদাবাজিতে সবচেয়ে বেশি বেপরোয়া ও অর্থ উপার্জন করছে সার্জেন্ট রাসেল, সাইদুর, টিএসআই রুবেল, খাইরুল, কাইয়ুম, মাছুমসহ আরো কয়েকজন। অনেক ট্রাফিকপুলিশের একাধিক অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা নগরীতে চলাচল করছে তার তথ্যও রয়েছে বারুদের কাছে। 

সিলেটে নাম্বারবিহীন সিএনজি অটোরিকশা দিয়ে মোবাইল, টাকা ছিনতাইসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হয়ে আসছে। মামলা হলে অপরাধীদের সনাক্ত করা কঠিন হওয়ার ফলে নাম্বারবিহীন যানবাহন দিয়ে ছিনতাই, চুরি-ডাকাতিসহ নানা অপরাধ ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। 

চুক্তির বাহিরে যেসব যানবাহনকে মামলা দিয়ে রেকার করে দক্ষিণ সুরমার আলমপুরের ডাম্পিং ইয়ার্ডে প্রেরণ করা হয় সে স্থানও রয়েছে অরক্ষিত। বিশাল ডাম্পিং এলাকায় একটি সিসি ক্যামেরা ও কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও বনজঙ্গলে ঘেরা ডাম্পিং ইয়ার্ড থেকে চুরি হচ্ছে যানবাহনের নানা জিনিষপত্র। যানবাহন মালিকদের অভিযোগ- জরিমানা পরিশোধ করে যানবাহন নিয়ে এসে দেখা যায় এটা ওটা খুলে নেয়া হয়েছে। তারা প্রশ্ন রেখে বলেন, জরিমানার টাকা দিয়ে ডাম্পিং ইয়ার্ডের উন্নয়ন কাজ না করে সে টাকা কোথায় যায়। যারা জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারেনা তাদের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্র-জনতার দৌড় খাওয়ার পরও চরিত্রের পরিবর্তন না হওয়ায় পুলিশ সদস্যরা চাঁদাবাজির গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেনা। 

ট্রাফিক অফিসের বাহিরে
অফিসারদের মাসিক চুক্তির চাঁদার টাকায় ভাগ বসানোর অপকৌশল করেন ট্রাফিক ডিসি উপ-পুলিশ কমিশনার বি এম আশরাফ উল্লাহ তাহের। তিনি যানবাহনে বেশি করে মামলা দিতে অফিসারদের টার্গেট আরোপ করেন (প্রতিদিন ৫টা মামলা ও ৫টা রেকার)। তিনি দুদিন দ্বিগুন রেকার বিল আদায় করান। ফুটপাত, স্ট্যান্ড ও অবৈধ যানবাহন থেকে সংগ্রহকৃত চাঁদার টাকার বণ্টন দ্বন্দ্বে জড়ান। ক্ষমতার অপব্যবহার প্রয়োগের চেষ্টা করার কারনে তাকে ট্রাফিক বিভাগ থেকে সরাতে গত ৩ জানুয়ারি জাতীয় একটি দৈনিকে প্রতিবেদন করান কয়েকজন অফিসার। তার পরদিন আশরাফ উল্লাহ তাহেরকে অন্যত্র বদলি করা হয়। তাহেরের স্থলাভিষিক্ত করা হয় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক ডিবি প্রধান তাহিয়াত আহমেদ চৌধুরীকে। 

তিনি চেয়ারে বসে পূর্বের ডিসির তালিকা থেকে সড়কে দায়িত্বপালনরত অবস্থায় অফিসে ডেকে নিয়ে আকস্মিক সার্জেন্ট নুরুল হুদা, তানভীর, সঞ্জয়, টিএসআই নুর নবী, শাহিন, এটিএসআই কাইয়ুম ও ইব্রাহিমসহ কয়েকজন কনস্টেবলকে বদলি করেন। সম্প্রতি যোগদান করে বেপরোয়া টিআই শফিক ও সোহেল। অন্যান্যদের বদলি করানোর হোতা হিসেব মনে করা হচ্ছে টিআই মোশারফ, নুরে আলম ও আজাদকে। 

তাহিয়াত আহমদ চৌধুরীর বাড়ি মৌলভীবাজার কুলাউড়া উপজেলায়। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও কুলাউড়ার সন্তান শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি বর্ষণ, গভীর রাতে আন্দোলনকারীদের বাড়ি তল্লাশি করেন ও ভয়ভীতি দেখান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাহিয়াত আহমেদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুটি মামলা হয়। এমন ফিরিস্তি তুলে ধরে উপর মহলে অভিযোগ করা হলে এসএমপি'র ট্রাফিক ডিসির চেয়ারে বসার তিনদিনের মাথায় তাকেও বদলি করা হয়। 

বর্তমানে সিলেট মেট্রোপলিটন ট্রাফিকপুলিশের ডিসি হিসেবে সংযুক্ত করা হয় মাহফুজুর রহমানকে। টিআই, সার্জেন্ট, টিএসআই, এটিএসআইরা তাদের বেসমেন্টদের নিয়ে গ্রুপ গড়ে তুলেছেন। উচ্চপদস্থ অফিসারদের আস্থাবাজন হয়ে এবং যে যার বলয়কে ব্যবহার করে মাঠপর্যায় চাঁদাবাজির মহৎসব চালিয়ে যাচ্ছেন। 

ট্রাফিক অফিসের ব্যয়ভারের নামে চাঁদা সংগ্রহ বন্ধ করা এবং চাঁদাবাজ অফিসারদের সিন্ডিকেট ভেঙ্গে অনৈতিক আয়ের পথ বন্ধ করা গেলে যানজটবিহীন নগরীর দেখা মিলবে। নগরীর বন্ধ পয়েন্ট খোলে দিয়ে সড়কের মধ্য থেকে বাঁশ সরিয়ে নিতে মাহফুজুর রহমান ভূমিকা রাখলে নগরবাসীর মাঝে শান্তি আসবে এমনটি মনে করেন সচেতন মহল।


সিলেট প্রেস / ১৪ জানুয়ারি ২০২৫/ এফ কে


কমেন্ট বক্স
স্টাফ রিপোর্টার

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ: ২০২৫-০১-১৪ ০৭:৫৮:৪৪