আসন্ন ঈদুল আজহা ঘিরে সীমান্ত পেরিয়ে সিলেটে অবৈধ পথে আসছে ভারতীয় গরু। বিজিবি ও পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোরবানির পশুর হাটে পৌঁছে যাচ্ছে ভারতীয় গরু। এতে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অপরদিকে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন খামারিরা।
খামারিরা বলছেন, কোরবানি ঘিরেই সারা বছর গরু লালন-পালন করেন খামারিরা। পুরো বছরের বিনিয়োগের রিটার্ন আসে কোরবানির ঈদে। কিন্তু অবৈধ পথে ভারতীয় চোরাই গরু-মহিষের চালান বাজারে আসায় স্লান হচ্ছে খামারিদের স্বপ্ন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেট জেলার কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলার সীমান্ত দেশের অন্যতম শীর্ষ চোরাই পথ। এই সীমান্ত চোরাকারবারিদের অভয়ারণ্য। চোরাই পথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আসা গরু-মহিষের চালান রাত থেকে সকাল পর্যন্ত শত শত ট্রাকে ঢুকছে নগরীতে। সীমান্ত পেরিয়ে আসা পশুর চালান সিলেট হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে দেশের অন্য জেলায়ও।অভিযোগ রয়েছে, এইসব চালানের নেপথ্যে গোলাম হোসেন, কয়েস ও জালাল মেম্বারের সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন স্থানীয় বিছনাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ও হাদারপাড় বাজারের ইজারাদার জালাল আহমদ।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমেদ বলয়ের অনুসারী হিসেবে পরিচিত থাকলেও, পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি ‘বিএনপি কর্মী’ ও ‘তারেক রহমানের আদর্শের সৈনিক’ সেজেছেন গোলাম হোসেন। বর্তমানে তিনি নিজেকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর ‘ঘনিষ্ঠ’ দাবি করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করছেন। নিজেকে বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ দাবি করলেও, মন্ত্রী দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে এসব অপরাধীর সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
তথ্য বলছে, ক্ষমতাসীন দলের কিছু অসাধু নেতাকর্মী ও প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তারা জড়িত এই চোরাই সিন্ডিকেটে। এই সিন্ডিকেট শুধু অবৈধ পথে ভারত থেকে গরু এনেই শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ওসির নাম ভাঙিয়ে এমন কর্মকাণ্ড চললেও রহস্যজনক ভাবে নীরব স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।
জানা গেছে, ভারতীয় গরু-মহিষের চোরাচালান রোধে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সিলেট নগরীর প্রবেশদ্বারগুলোতে বসানো চেকপোস্ট ও সিসি ক্যামেরা ফাঁকি দিয়ে নির্বিঘ্নে ভারতীয় গরু পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। রাজনৈতিক প্রভাবশালী চক্র ও প্রশাসনের যোগসাজস থাকায় উপর মহলের ভয়ে সাধারণ মানুষও এ নিয়ে কথা বলতে সাহস করেন না।
এদিকে, ভারতীয় পশু চালান অবাধে প্রবেশ করায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন সিলেটের প্রান্তিক খামারিরা। বছরজুড়ে ধার-দেনা করে পশু লালন-পালন করার পর এখন ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে চরম সংশয়ে আছেন এ খাতের উদ্যাক্তারা।
রুহল এগ্রো ফার্মের কর্ণধার রুহুল চৌধুরী বলেন, ‘প্রতি বছরের ন্যায় এবারো দেশী গরুর খামার করি। সারা বছর পেলেপোষে গরু বড় করলাম। এখন লাভের মুখ দেখা দায় হয়ে পড়বে ভারতীয় গরু-মহিলের বাজার সয়লাভ হওয়ার কারণে।’
খামারি মুহাম্মদ শফিউল্লাহ বলেন, ‘খামারি ও ইজারাদারদের স্বার্থ রক্ষায় সীমান্ত থেকে শুরু করে পশুর হাট পর্যন্ত প্রশাসনের কঠোর ও দৃশ্যমান নজরদারি এখন সময়ের দাবি।’
কেবল খামারিরাই যে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তা নয়, লোকসানের শঙ্কায় আছেন সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকার পাঁচটিসহ জেলার অর্ধশতাধিক পশুর হাটের ইজারাদাররা। তারা জানিয়েছেন, অবৈধ পশুর কারণে বৈধ হাটে ক্রেতা কমছে। রাজস্ব আদায়ও ব্যাহত হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেলুর রহমান বলেন, চোরাচালান দমনে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছি। পশুর অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান চলছে এবং কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সিলেটপ্রেস প্রতিবেদক




















