সিলেট নগরীর ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের দর্জিবন্দ ও রায়নগর এলাকায় এখন টক অব দ্য টাউন—জামিনুল ইসলাম জামি। মাত্র ১৮ মাস আগেও যিনি ছিলেন একটি সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান, আজ তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক। বিলাসবহুল বাড়ি, দামী গাড়ি আর কাড়ি কাড়ি নগদ টাকার মালিক বনে যাওয়া জামির এই অবিশ্বাস্য উত্থানকে স্থানীয়রা দেখছেন ‘আলাদিনের চেরাগ’ পাওয়ার মতো এক অলৌকিক ঘটনা হিসেবে। তবে এই রূপকথার মতো সফলতার আড়ালে বেরিয়ে এসেছে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল এবং পাথর লুটের এক অন্ধকার জগতের রোমহর্ষক কাহিনী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত দেড় বছরে জামির আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে উল্কার গতিতে। দর্জিবন্দের বসুন্ধরা ১১১/বি নম্বর ভূমিতে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি বিশাল বহুতল ভবন, যার দ্বিতীয় তলার কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এলাকাটিতে রাজকীয় ভঙ্গিতে দামী প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল নিয়ে দাপিয়ে বেড়ানো জামির জীবনযাত্রা দেখে হতবাক স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের প্রশ্ন—কোনো বৈধ উপায়ে মাত্র ১৮ মাসে এত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া কি আদৌ সম্ভব?
জামির এই বিশাল সম্পদের নেপথ্যে রয়েছে কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর কোয়ারি থেকে অবৈধভাবে পাথর লুটপাট এবং বেপরোয়া চাঁদাবাজি। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি ও তার সিন্ডিকেট পাথর রাজ্য থেকে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এছাড়া দর্জিবন্দ ও আশেপাশের এলাকায় বড় কোনো উন্নয়ন কাজ বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করতে হলে জামিকে দিতে হয় মোটা অংকের মাসোহারা।
জামির এই বেপরোয়া আচরণের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে তার পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়। তার বাবা নজরুল ইসলাম বুলু সিলেট মহানগর ১৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) অন্যতম উপদেষ্টা। বাবার রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে জামি ও তার পরিবার এলাকায় সাধারণ মানুষের জমি ও প্লট দখলের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
এলাকায় নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখতে জামি গড়ে তুলেছেন একটি বিশাল ‘কিশোর গ্যাং’। দর্জিবন্দ, দপ্তরীপাড়া, রায়নগর, রাজবাড়ী, মিতালী, ঝর্ণারপাড় ও টিবি গেইট এলাকায় এই বাহিনীর মাধ্যমেই তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন অপরাধ জগৎ। বিভিন্ন কলোনির নেশাগ্রস্ত ও বিপদগামী কিশোরদের নিয়ে গঠিত এই বাহিনী জামির ‘পেশীশক্তির’ প্রধান উৎস। এই চক্রের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম তদারকি করে জামির ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা তানভীর। তানভীরের নেতৃত্বে এই কিশোর গ্যাং বৃহত্তর রায়নগর এলাকায় চাঁদাবাজি ও মারামারি সহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনমনে ত্রাস সৃষ্টি করে চলেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, জামি ও তার বাহিনীর ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। প্রতিবাদ করলেই কিশোর গ্যাং দিয়ে হামলা বা হুমকি দেওয়া হয়। আমরা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
১৮ মাসের এই জাদুকরী অর্থনৈতিক উত্থান এবং অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ে জনমনে ক্ষোভ থাকলেও জামি ও তার সহযোগীরা এখনো অধরা। সিলেটের সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত এই ‘আলাদিনের চেরাগের’ রহস্য উদঘাটন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
স্টাফ রিপোর্টার




















