২৩ বছরে সিলেটে নগরায়ণ বেড়েছে ৩০০ শতাংশ

  • প্রকাশের সময় : ০৪/০৬/২০২৬ ০৩:৫২:১২ PM

Share
7

সিলেটে গত দুই দশকের বেশি সময়ে দ্রুত বদলে গেছে ভূমির ব্যবহার ও প্রাকৃতিক পরিবেশের চিত্র। একদিকে কমেছে নদী, খাল-বিল, জলাভূমি ও উন্মুক্ত পানি ধারণকারী এলাকা; অন্যদিকে বেড়েছে নগরায়ণ, কংক্রিটের স্থাপনা ও অবকাঠামো। গবেষকরা বলছেন, এই পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করছে না, বরং আকস্মিক বন্যা, জলাবদ্ধতা ও দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলছে।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষক এস এম নজমুল হক এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষক মো. জাহির উদ্দিন। 


গবেষণায় ২০০০, ২০০৫, ২০১০, ২০১৫, ২০২০ ও ২০২৩ সালের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে সিলেট জেলার ভূমি ব্যবহার ও ভূমি আচ্ছাদনের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। গবেষণায় গুগল আর্থ ইঞ্জিন, ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইট ডেটা এবং র‌্যান্ডম ফরেস্ট ক্লাসিফায়ার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে সিলেটের ভূমিকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়- নগর এলাকা, খালি জমি, জলাশয় ও উদ্ভিদ আচ্ছাদন।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিলেট জেলায় নগর এলাকা প্রায় ৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে জলাশয় ও জলাভূমি কমেছে প্রায় ৭৭ শতাংশ। গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ধ্বংস এবং অপরিকল্পিত নগর বিস্তারের ফলে সিলেটের মতো বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে ঝুঁকি আরো বাড়ছে।  


গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে সিলেট জেলার মোট ভূমির ৩৪ দশমিক ২৫ শতাংশ ছিল জলাশয় ও পানিপূর্ণ এলাকা। ২০২৩ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশে। অর্থাৎ ২৩ বছরে সিলেট তার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জলাভূমি হারিয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, সিলেটের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে জলাশয় কমে যাওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ফলে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ধারণের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং অতিরিক্ত পানি দ্রুত প্লাবন ভূমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।

বিশ্বনাথ উপজেলায় জলাশয় কমেছে সবচেয়ে বেশি। সেখানে পানিপূর্ণ এলাকা হ্রাসের হার প্রায় ৯০ শতাংশ। এছাড়া, বিয়ানীবাজার, দক্ষিণ সুরমা, গোলাপগঞ্জ, জকিগঞ্জ ও সিলেট সদরেও জলাশয়ের বড় ধরনের সংকোচন দেখা গেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০০ সালের জলাশয়ের প্রায় ৭ শতাংশ এলাকা ২০২৩ সালের মধ্যে নগর এলাকায় রূপান্তরিত হয়েছে। এছাড়া ৫ দশমিক ৫ শতাংশ জলাশয় খালি জমিতে পরিণত হয়েছে।

গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০০০ সালে সিলেট জেলার মোট ভূমির মাত্র ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ ছিল নগর এলাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৪৬ শতাংশে। বিশেষ করে সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা, গোলাপগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও বিয়ানীবাজার উপজেলায় নগর বিস্তার সবচেয়ে বেশি হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, গ্রাম থেকে শহরমুখী মানুষের চাপ, নতুন আবাসন প্রকল্প, বহুতল ভবন, হোটেল, বিপণিবিতান ও সড়ক অবকাঠামো বৃদ্ধির কারণে এই পরিবর্তন ঘটেছে।

উপজেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিয়ানীবাজার উপজেলায় নগর এলাকা বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ শতাংশ। সিলেট সদর উপজেলায় বেড়েছে প্রায় ২৪০ শতাংশ। ফেঞ্চুগঞ্জে নগরায়ণ বেড়েছে এক হাজার শতাংশের বেশি।

২০০০ সালে সিলেট সদরে নগর এলাকা ছিল প্রায় ২ হাজার ৩৮৫ হেক্টর। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১১১ হেক্টরে। একই সময়ে গোয়াইনঘাটে নগর এলাকা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৮৫৬ হেক্টর।  

প্রকাশনায় ‘হটস্পট’ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেসব এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে ভূমি ব্যবহার সবচেয়ে বেশি বদলেছে। এতে দেখা যায়, বালাগঞ্জ, সিলেট সদর, কোম্পানীগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ভূমি রূপান্তর ঘটেছে।

বালাগঞ্জ উপজেলায় সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এলাকাকে ভূমি পরিবর্তনের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব এলাকায় দ্রুত নগর বিস্তার, ভূমি উন্নয়ন ও মানবিক হস্তক্ষেপের কারণে পরিবেশগত পরিবর্তন বেশি ঘটেছে।

অন্যদিকে কানাইঘাট, জৈন্তাপুর ও জকিগঞ্জের কিছু এলাকায় তুলনামূলক কম পরিবর্তন হয়েছে। এসব এলাকাকে ‘কোল্ডস্পট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কানাইঘাটে সবচেয়ে বেশি স্থিতিশীল ভূমি পাওয়া গেছে।

গবেষণায় ২০০৫ সালে উদ্ভিদ আচ্ছাদনের অস্বাভাবিক হ্রাস এবং খালি জমির ব্যাপক বৃদ্ধির বিষয়টিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, ২০০৪ সালের দীর্ঘস্থায়ী আগাম বন্যা সিলেট অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি ও সবুজ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। এর ফলে বহু এলাকা সাময়িকভাবে খালি জমিতে পরিণত হয়।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৫ সালে খালি জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় মোট ভূমির ৫৬ দশমিক ৬৬ শতাংশে। একই সময়ে উদ্ভিদ আচ্ছাদন কমে দাঁড়ায় ২৪ দশমিক ৩৮ শতাংশে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, সিলেট ভৌগোলিকভাবেই বন্যাপ্রবণ অঞ্চল। পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি ও নদীর প্রবাহের কারণে এখানে আকস্মিক বন্যা প্রায়ই দেখা যায়। তবে, সাম্প্রতিক নগরায়ণ ও জলাশয় ধ্বংস পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

গবেষকদের মতে, কংক্রিটের স্থাপনা ও অপরিবাহী ভূমি বাড়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত জমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা সংকুচিত হওয়ায় পানি নামতে পারছে না। এর ফলে নগর এলাকায় জলাবদ্ধতা এবং নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে।

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের গবেষক মো. জাহির উদ্দিন বলেছেন, ‍“সিলেটকে ভবিষ্যৎ দুর্যোগ ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে এখনই টেকসই নগর পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অনিয়ন্ত্রিত ভূমি ভরাট বন্ধে কঠোর উদ্যোগ প্রয়োজন।

সিলেটের নাগরিক আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার ও ধরিত্রী রক্ষায় আমরা- ধরা সিলেটের সদস্য সচিব আব্দুল করিম চৌধুরী বলেন, “সিলেট নগরী গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিত উপায়ে। সরকারি-বেসরকারিভাবে গড়ে তোলা নগরায়নে অবজ্ঞা করস হয়েছে সিলেটের ভূপ্রকৃতি। কেটে ফেলা হয়েছে পাহাড়টিলা। ভরাট করা হয়েছে একের পর এক জলাভূমি। আশির দশকে সরকারি উদ্যোগে সিলেটে শাহজালাল উপশহর জলাভূমি ভরাট করে গড়ে তোলা হয়। বিগত দশকে বাঘার হাওড়ের অনেকাংশ ভরাট করে স্থাপন করা হয় সেনানিবাস। জলাভূমি ভরাটের প্রচেষ্টা বন্ধ হয়নি।

ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, “জলাভূমি শুধু পানি ধারণ করে না, এটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। এগুলো হারিয়ে গেলে শহর দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে জলাবদ্ধতা ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়বে।

তিনি বলেন, “সিলেটে ২৩ বছরে জলাভূমি ৭৭ শতাংশ কমে যাওয়া এবং একই সময়ে নগরায়ণ ৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া শুধু ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনের পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি গভীর প্রতিবেশগত সতর্ক সংকেত। এই প্রবণতা দেখাচ্ছে, উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রাকৃতিক ব্যবস্থা উপেক্ষা করলে তা স্থায়ীত্বশীল হয় না। এখনই জলাভূমি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারকে নগর পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনা জরুরি।


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৬-০৬-০৪ ১৫:৫২:১২