জালালাবাদ ক্যান্টেনমেন্ট স্কুলছাত্র মাহাদি আনজুমের (১৫) গলায় ফাঁস নিয়ে নানা রহস্য দেখা দিয়েছে। লাশের প্রত্যক্ষদর্শী এবং তার স্বজনরা এটাকে আত্মহনন হিসেবে মেনে নিতে পারছেন না। তাদের দাবি, মাহদিকে পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় হত্যার পর আত্মহননের নাটক সাজানো হয়েছে। তারা মাহদির বাবা ব্যবসায়ী মিসবাহ উদ্দিনের মৃত্যুর বিষয়টিও সামনে এনে বলছেন, তার মৃত্যু রহস্যেরও সুরাহা হয়নি।
মাহদির মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে ভাবছে পুলিশ প্রশাসনও। মাহদির মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে চারটি বিষয় সামনে রেখে তদন্তে নামছে পুলিশ। এমনটি জানিয়েছেন লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী এয়ারপোর্ট থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) আতিকুল ইসলাম।
তিনি বলেন, মাহদির মৃত্যু রহস্য উদঘাটনে ময়না তদন্ত প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত চারটি বিষয়ের ওপর তদন্তে জোর দেওয়া হবে। এরমধ্যে তার সৎ বাবার কারণে কোনো পরিবারিক ক্রাইসিস আছে কিনা, গলায় ফাঁস লাগানো রশির গিট্টু (ফাঁকি) প্রশিক্ষিত লোকদ্বারা তৈরী কিনা, দরজা না ভেঙে ঘরে ঢুকা এবং ২০২২ সালে মাহদির বাবা মিসবাহ উদ্দিনকে পিটিয়ে হত্যা করা। এক অর্থে বাবার পথে ছেলেকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো কিনা?
২০২২ সালে ১৪ জুলাই ব্যবসায়ী মিজবাহ উদ্দিন তার স্ত্রী বর্তমান এনসিপি নেত্রী ডা. রুলি বেগমের গোলাপগঞ্জ চেম্বার সংলগ্ন ব্যাংকে গিয়ে নিখোঁজ হন। এরপর ১৯ জুলাই সকোলে মিজবাহকে জখমী অবস্থায় উদ্ধার করে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে বন্দরবাজার ফাঁড়ি পুলিশ। পরে নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। কিন্তু পরবর্তীতে হাসপাতাল থেকে ময়না তদন্তে তাকে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু দেখানো হয়।
ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে নিহতের মা রীনা বেগম আদালতে মামলা দায়ের করেন রুলিসহ তার বর্তমান (অজ্ঞাত) স্বামীকেও আসামি করেছিলেন। তখন আনজুম আহমদের বয়স ১২ বছর ও মেয়ে অনিকার বয়স ১৬ উল্লেখ করা হয়। টাকা আত্মসাতের ঘটনায় মিজবাহ ও রুলির মধ্যে বিচ্ছেদ হয়। স্ত্রীর ডা. রুলির বিরুদ্ধে ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলাও দায়ের করেছিলেন মামলায় উল্লেখ করা হয়। মামলাটি তদন্ত করে চুড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় গোলাপগঞ্জ থানার প্রাক্তণ এসআই মোহাম্মদ লুৎফুর রহমান।
ওই বছরের ৯ আগস্ট তার দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ডা. রুলি বেগম, স্বামী রিজভী চৌধুরী এবং শফিক তালুকদারকে মামলা থেকে অব্যহতি চান। এছাড়া মৃত্যু হার্ট অ্যাটাকে হয়েছে উল্লেখ করেন চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। ওই ঘটনায় এলাকাবাসী হত্যাকা-ের ঘটনা নিয়ে স্বোচ্ছার হলে উল্টো সাইবার আইনে মামলা দায়ের করেছিলেন ডা. রুলি। এবার ঘুরে ফিরে আবারো সন্দেহের তীর এনসিপি নেত্রী ডা. রুলির বর্তমান স্বামী রিজভী আহমদ চৌধুরীর দিকে।
মঙ্গলবার বেলা ১টার দিকে বিমানবন্দর থানা পুলিশ দাবি করে, ফায়ার সার্ভিসের সহযোগীতায় ওই ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ থেকে মাহদির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে।
নিহত আনজুম আহমদ মাহদি (১৫) সুবিদবাজার এলাকার মিয়া ফাজিলচিশত ১৩/৩ নম্বর বাসার চতুর্থ তলার বাসিন্দা মৃত মিসবাহ উদ্দিন ও ডা. রুলী বিনতে রহিম দম্পতির ছেলে। তিনি সিলেট ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করেছে। চিরকুটটি মাহাদির কিনা, সেটাও যাচাই করছে পুলিশ। "চিরকুটে ইংরেজিতে মরদেহের ময়নাতদন্ত না করা এবং পুলিশকে এ ঘটনার তদন্ত না করার অনুরোধ জানানো লেখা রয়েছে, জানিয়েছে পুলিশ।" এখন সেটা নিয়েও সন্দেহ তৈরী হয়েছে-লেখাটিমাহদির কিনা, সেটা প্রয়োজনে এক্সপার্টেও পাঠানো হতে পারে।
ঘটনার পর এসএমপির বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যার ঘটনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে বিস্তারিত তদন্ত করা হচ্ছে।
এদিকে, ডা. রুলির কথাবার্তায় অসংলগ্নতা লক্ষ্য করছেন বলেও দাবি করছেন স্বজনরা। ছেলেকে নাকি তিনি সকালে স্কুলে যাওয়ার জন্য কাপড় বের করে রাখতে বলেন। আর তাকে ডাকা হয় দুপুরে। এছাড়া তার স্বামীর সন্দেহজনক আচরণ লক্ষ্য করছেন তারা। তাদের দাম্পত্য জীবন থেকে মাহদীকে সরাতে আত্মহননের নাটক মঞ্চস্থ করা হতে পারে।



















