সিলেটে ফার্মের মুরগির মাংস থেকে প্রথমবার শিশুর শরীরে বার্ড ফ্লু শনাক্ত

  • প্রকাশের সময় : ২০/০৭/২০২৬ ০১:৫৩:৪৭ PM

ফাইল ছবি

Share
14

সিলেটে প্রথমবারের মতো এক বছর ৬ মাস বয়সী এক শিশুর শরীরে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড-ফ্লু (এইচ/৫) ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। ফার্মের মুরগি থেকে তার দেহে এই ভাইরাস ছড়ায় বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সে সিলেট অঞ্চলে বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়া প্রথম রোগী বলে নিশ্চিত করেছে সরকারের বিশেষ তদন্ত দল। তবে বর্তমানে শিশুটি সুস্থ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন।


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২৭ শে মার্চ সিলেট নগরীর বালুচর এলাকার ১ বছর ৬ মাস বয়সী ওই শিশু তীব্র জ্বর ও খিঁচুনি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরবর্তীতে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শিশুটির শরীরে হামের সংক্রমণ ধরা পড়ে। ১৯ এপ্রিল আইসিডিডিআর,বি ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষিত নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে শিশুটির শরীরে 'ইনফ্লুয়েঞ্জা এ/এইচ ফাইভ' ভাইরাস শনাক্ত হয়। পরে এই ঘটনার কারণ ও উৎস অনুসন্ধানের জন্য আইইডিসিআর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং আইসিডিডিআর,বি-এর সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়। তদন্ত দলটি গত ২১ শে এপ্রিল থেকে ২৫ শে এপ্রিল পর্যন্ত সিলেটের বালুচর এলাকায় অবস্থান করে মাঠ পর্যায়ে নিবিড় অনুসন্ধান পরিচালনা করে। তদন্তকারী দল তদন্ত চলাকালীন ওই এলাকার হাঁস এবং সংগৃহীত পরিবেশগত নমুনায় 'ইনফ্লুয়েঞ্জা এ, এইচ ফাইভ' ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। তদন্ত দলের মতে, আক্রান্ত বাড়ির আশেপাশে অস্বাস্থ্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পোল্ট্রি পাখি পালনই এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ তদন্ত দলের রিপোর্টে বলা হয়েছে, শিশুটির পরিবার থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী- অসুস্থ হওয়ার পূর্বে শিশুটি বাড়িতে নিয়ে আসা জবাই করা কাঁচা ফার্মের মুরগির মাংস নাড়াচাড়া করেছিল। 


ধারণা করা হচ্ছে, সেখান থেকেই সে সংক্রমিত হয়। পরবর্তীতে শিশুটির বাবা ও মায়ের শরীরেও ইনফ্লুয়েঞ্জা সদৃশ উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। বর্তমানে তারা সকলেই সুস্থ আছেন।


সিলেটে প্রথম এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়ার পর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত দল স্থানীয় বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে। তবে নতুন করে আর কোনো ব্যক্তির শরীরে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এ,এইচ/৫ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি বর্তমানে প্রশাসনের নজরদারিতে রয়েছে।


দেশে চলতি বছর তৃতীয়বারের মতো মানবদেহে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এ এইচ৫ বা বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়েছে। সিলেট বিভাগের এই শিশুর শরীরে গবেষণাগারে এ ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে এ তথ্য জানায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। ২০০৮ সাল থেকে ডব্লিউএইচওর কাছে বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এ (এইচ৫)-এর ১৫টি মানব কেস রিপোর্ট করা হয়েছে, যার মধ্যে দুটি মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে। একটি ২০১৩ সালে এবং অন্যটি চলতি বছর।


সিলেট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মিজানুর রহমান মিঞা বলেন, শিশুটি মুরগির মাংস থেকে বার্ড ফ্লু-তে আক্রান্ত হয়। আমরা এটির তদন্ত করেছি। এটা শুধু পাখি থেকে যে ছড়ায়, এমন না। মানুষে মানুষেও ছড়াতে পারে। যেকোনো সময় যেকোনো ভাইরাসই মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে। সেজন্য সবার সচেতন থাকা উচিত। মৃত পাখিকে সাথে সাথে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে অথবা আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।


সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন বলেন, শিশুটির নমুনা পরীক্ষা করে যখন বার্ড ফ্লু ধরা পড়ে, তখন বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। শুরুতে তার বাবা-মায়ের শরীরে কিছুটা উপসর্গ পেলেও বর্তমানে তারা সুস্থ আছেন। এটি ভাইরাস আকারে একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়াতে পারে। আবার করোনার মতো মহামারি আকারেও ছড়াতে পারে। সেজন্য সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো অ্যাফেক্টেড বার্ড থেকে এটি ছড়িয়ে যেতে পারে।


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বার্ড ফ্লু বা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা হলো মূলত পাখিদের একটি সংক্রামক রোগ, যা একটি নির্দিষ্ট ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের কারণে হয়। সাধারণত এই ভাইরাস পাখিদের আক্রান্ত করলেও কিছু কিছু স্ট্রেন মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীকেও আক্রান্ত করতে পারে। মানুষের শরীরে আধুনিক রূপের মারাত্মক বার্ড ফ্লু ভাইরাস প্রথম ছড়ায় ১৯৯৭ সালে হংকংয়ে সেখানে মুরগির খামার থেকে মানুষের দেহে ভাইরাসটি প্রবেশ করে এবং ১৮ জন আক্রান্ত মানুষের মধ্যে ৬ জন মারা যান।


বার্ড ফ্লু পাখি এবং মানুষ উভয়ের জন্যই মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে বার্ড ফ্লু সাধারণ ফ্লুর মতো লক্ষণ দেখা দিলেও এটি খুব দ্রুত মারাত্মক রূপ নিতে পারে। রোগটি মারাত্মক আকার ধারণ করলে নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হতে পারে। সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার তুলনায় মানুষের শরীরে বার্ড ফ্লু সংক্রমণের মৃত্যুর হার অনেক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৫০% থেকে ৬০% পর্যন্ত মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। আর কিছু তীব্র ক্ষমতাসম্পন্ন বার্ড ফ্লু ভাইরাসের কারণে খামারের হাঁস-মুরগি খুব দ্রুত মারা যায়। বার্ড ফ্লু থেকে বাঁচতে খামারে কাজ করার সময় মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করা উচিত এবং যেকোনো হাঁস-মুরগির মাংস বা ডিম খুব ভালোভাবে সম্পূর্ণ সেদ্ধ করে রান্না করা জরুরি।


বার্ড ফ্লু কীভাবে ছড়ায়?


এই ভাইরাসটি প্রধানত অসুস্থ বা মৃত হাঁস-মুরগি, কবুতর কিংবা বুনো পাখির লালা, নাকের শ্লেষ্মা বা চোখের পানি এবং মল-মূত্রের সরাসরি সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাসটি সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। আক্রান্ত পাখির মল বা তরল যেখানে লেগে থাকে- যেমন খামারের খাঁচা, খাবার ও পানির পাত্র, খামারিদের জুতো, জামাকাপড় এমনকি ব্যবহৃত যানবাহন-সেগুলো স্পর্শ করার পর ভালোভাবে হাত না ধুয়ে চোখ, নাক বা মুখে দিলে ভাইরাসটি মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। বাতাসে উড়ে আসা পাখির শুকনো মলের ধূলিকণা থেকেও এটি ছড়াতে পারে। আক্রান্ত পাখির মাংস বা ডিম ভালোভাবে সেদ্ধ না করে খেলে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।


৩ দফতরের করা তদন্ত প্রতিবেদন থেকে কিছু সুপারিশ দেওয়া হয়। যেগুলো হলো- এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত রোগী শনাক্ত করা এবং পরীক্ষা করে রোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত অবহিত করা; পোল্ট্রি খামারগুলোতে অস্বাভাবিক মৃত্যু দেখা দিলে প্রাণিসম্পদ বিভাগের মাধ্যমে দ্রুত অবহিত করা এবং তা নিয়ন্ত্রণের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা; মৃত পাখি সঠিকভাবে মাটিতে পুঁতে ফেলার প্রশিক্ষণ দেওয়া; পোল্ট্রি খামারে টিকা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অসুস্থ পাখি আলাদা রাখার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা; স্থানীয় স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদ্রাসা এবং কমিউনিটি সেন্টারে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার ঝুঁকি ও প্রতিরোধ সম্পর্কে কর্মশালা আয়োজন; সব পোল্ট্রি খামারের নিবন্ধন ও নিয়মিত মনিটরিং বাধ্যতামূলক করা; আবাসিক এলাকার কাছে অবস্থিত খামারে স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি প্রয়োগ করা; জরুরি প্রয়োজনে ভবিষ্যৎ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণে মানবস্বাস্থ্য, প্রাণীস্বাস্থ্য, বন্যপ্রাণী, ও পরিবেশসহ সমন্বিতভাবে স্থানীয় ওয়ান হেলথ র‍্যাপিড রেসপন্স টিম গঠন এবং প্রস্তুত রাখা।


সিলেট প্রেস / aa


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৬-০৭-২০ ১৩:৫৩:৪৭