পর্যটন নগরী সিলেটের জিন্দাবাজারের বিভিন্ন মার্কেটের সামনে বেলুন ও ফুল হাতে থাকা একদল শিশুদের ভোর থেকে রাত পর্যন্ত দেখা যায়। তারা পথচারী ও প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিকশা দেখামাত্র দৌড়ে গিয়ে একটি বেলুন কেনার আকুতি জানায়। কেনাকাটা করতে আসা মা বাবার সাথে থাকা ছোট্র শিশুকে বেশি টার্গেট করে নাচুরবান্দার মতো টাকা না দেয়া পর্যন্ত পিছু তারা ছাড়েনা। যে বয়সে বাবা মায়ের আদর সোহাগ পেয়ে স্কুলে থাকার কথা সে বয়সে দারিদ্রতার কষাঘাতে পরে কোমলমতি শিশুরা রোজগার করতে নামছে পথে। কচি কচি শিশুদের মায়াবী মলিন মুখ দেখে অনেকে বেলুন নিয়ে কেউবা না নিয়ে পাঁচ, দশ টাকা দিয়ে সহায়তা করেন। ৯ থেকে ১৫ বছর বয়সী এসব শিশুরা নগরের কলোনীতে পরিবারের সাথে বসবাস করে। অনেকে পথশিশু। থাকে রেলওয়ে স্টেশন ও ক্বীনব্রিজের নিচে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ছেলে শিশুদের দিয়ে খুচরা ইয়াবা বিক্রি ও বড় সুন্দরী মেয়ে শিশুদের দিয়ে পতিতাবৃত্তি করানোর অভিযোগ রয়েছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। যে সব শিশু সারাদিন বেলুন ও ফুল বিক্রি করে যে টাকা উপার্জন করে তার অর্ধেকের বেশি হাতিয়ে নিচ্ছে ওই চক্র। কোনো শিশু টাকা না দিলে বা পালিয়ে গেলে তাকে ধরে নিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। অনেক শিশু মারধরের শিকার হয়ে অন্যত্র চলে গেছে। কেউ আবার মা-বাবার কড়া নজরদারিতে বেলুন, ফুল বিক্রি করতে দেখা গেছে। হতদরিদ্র অনেক শিশুকে দিয়ে মাদক বিক্রি করানোর ফলে অধিকাংশ শিশু মাদকাসক্ত। সাইকেল রিকশার টায়ারের টিউব, জুতা ও ফোমে ব্যবহৃত সলিউশন (আঠা) পলিথিনে ভরে কিছুক্ষণ পরপর পলিথিনে মুখ লাগিয়ে শ্বাস টেনে নেশা করায় আশক্ত। মাদকসেবীরা তার নাম দিয়েছে ড্যান্ডি। সলিউশনের একটি কৌটা ৩০ থেকে ৪০ টাকায় যত্রতত্র কিনতে পাওয়া যায় বলে অতি দরিদ্র শ্রেণীর মাদকসেবীদের কাছে ড্যান্ডিতে আশক্ত হওয়ার মাত্রা দিনদিন বেড়েই চলেছে।
জিন্দাবাজারে ড্যান্ডি পার্টিকে নিয়ন্ত্রণ করে অষ্টাদশী লেডী লিডার ফারজানা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক সন্তানের মা ফারজানা অল্প বয়সে বিয়ে করে। কিছুদিন পর সংসার ভেঙ্গে গেলে সুন্দরি হওয়ায় সে জড়িয়ে পড়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন থেকে বেলুন পার্টিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সে চৌহাট্রা যাত্রীছাউনীর পেছনে সরকারি আলিয়া মাদরাসা এলাকাসহ কয়েকটি স্থানে দুবেলা মাদকাসক্তদের দল বেঁধে মাদকসেবন (ড্যান্ডি) করায়। ড্যান্ডিতে আশক্ত শিশুদের মুখের ভেতর ভাঙ্গা ব্লেড থাকায় বহিরাগত বেলুন বিক্রেতা ভয়ে জিন্দাবাজার এলাকায় যায় না। কোনো পথচারীর সাথে ঝগড়া বিবাদে জড়িয়ে পরলে মুখ থেকে ব্লেড বের করে শরীরে ব্লেড দিয়ে টান মেরে দৌড়ে পালিয়ে যায়। ঝামেলা এড়াতে অনেকে এদের এড়িয়ে চলেন ও তাদের উৎপাতে কেউ সহজে প্রতিবাদ করেনা। একবার পুলিশ ড্যান্ডিতে আশক্ত কয়েক শিশুকে ধরে সিলেট সমাজ সেবা অফিসের মাধ্যমে শিশু সংশোধনাগারে প্রেরন করে। এক পর্যায় সেখান থেকে তারা বেড়িয়ে এসে পুনরায় বেলুন বিক্রি ও নানা অপরাধে জড়িয়ে পরে। সিলেট নগরে জিন্দাবাজারের মতো আরো কয়েকটি বেলুন বিক্রির ড্যান্ডি পার্টি রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করে ফারজানার মতো দুষ্কৃতকারীরা। এদের কারণে নগরে চলাচলকারীদের যেমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তেমনি সিলেটে ঘুরতে আসা পর্যটকদের মাধ্যমে সিলেটের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
রাজা ম্যানশনের বই বিক্রির দোকান কর্মচারী তাহিন বলেন, এদের উৎপাত দিনদিন বাড়ছে। কোনো কারণে কেউ একটা ধমক দিলে বেলুন হাতে একাধিক শিশু ও দুরে বসে থাকা তার অভিভাবক আক্রমণাত্মক মুখী হয়ে তেড়ে আসে। অনেকের মুখে আবার ব্লেড থাকে। সেজন্য অনেকে এদের এড়িয়ে চলেন। পুলিশকে সেদিকে একটু নজর দিতে তিনি আহবান জানান।
এ বিষয়ে সিলেটপ্রেস এর সাথে কথা হয় সিলেট সমাজসেবা অফিসের উপ পরিচালক আব্দুর রফিকের। তিনি বলেন, পুলিশ ওইসব শিশুদের ধরে মামলা দিয়ে আমাদের কাছে দিলে আমরা শিশু সংশোধনাগারে পাঠিয়ে দিবো। মামলা না দিলে অভিভাবক এসে শিশুকে নিয়ে যায় বলে তিনি জানান।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ইলিয়াছ শরীফ সিলেটপ্রেস কে বলেন, আপনারা দেখেছেন হিজড়াদের ধরে জেলে দিয়েছি। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেয়া হবেনা। দেখি, দক্ষিণের ডিসি ওই তরুণীকে চিনে কি না। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমি ডিসিকে নির্দেশনা দিবো।
গতকাল কথা হয় এসএমপির দক্ষিণের ডিসি আজবাহার শেখ এর সাথে, তিনি সিলেটপ্রেস কে বলেন, অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। শীঘ্রই তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ অভিযানে যাবে।
জাবেদ এমরান




















