এতদিন জাল দলিলে সরকারের খাসজমি বেচে দিচ্ছিল ভূমিখেকো চক্রটি। এবার সংঘবদ্ধ চক্রটির চোখ পড়েছে সরকারের লিজ দেওয়া চা বাগানের দিকে। সিলেটের বিভিন্ন চা বাগানের জমি ধীরে ধীরে দখল করে মালিক সেজে প্লট আকারে বিক্রি করে দিচ্ছে তারা।
বিক্রি করা ওই জমিতে গড়ে উঠছে পাকা ঘর। কোনো কোনো বাগানের জমি উদ্ধার করা হলেও নতুন করে কিছু জমি দখল করে নেওয়া হচ্ছে। সিলেট সদর উপজেলার খাদিম চা বাগান, বরজান চা বাগান, মালনীছড়া, লাক্কাতুরা, দলদলি চা বাগানসহ বিভিন্ন বাগান ঘুরে দেখা গেছে, বাগানের বেশ কিছু জমি চলে গেছে অন্যের দখলে।
গোয়াইনঘাটের ফতেহপুর চা বাগান মৌলভীবাজারের বড়লেখার দক্ষিণ শাহবাজপুর চা বাগান, রাজনগরের উত্তরভাগ ও ইন্দানগর চা বাগানের কিছু জমি চলে গেছে ভূমিখেকোদের কবজায়।
খাদিমপাড়া ইউনিয়নের মেজরটিলা থেকে বটেশ্বর, আম্বরখানা থেকে তারাপুর ও সালুটিকর পর্যন্ত রয়েছে কয়েকটি চা বাগান। এসব বাগানের সামনে থেকে কিছু টের পাওয়া না গেলেও পেছনে দখল শুরু হয়েছে। তারাপুর চা বাগানের জমি দখল ও বিক্রি চলছে।
২০১৬ সালের ১৫ মে শিল্পপতি রাগীব আলীর দখল থেকে হাজার কোটি টাকার তারাপুর চা বাগান উদ্ধার করে জেলা প্রশাসন। উদ্ধারের পর সাড়ে ৫০০ একর এলাকাজুড়ে থাকা চা বাগানটির দখল সেবায়েত পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। হাজার কোটি টাকার এই সম্পত্তি দীর্ঘদিন রাগীব আলীর দখলে ছিল। তারাপুর চা বাগান নিয়ে আদালত থেকে মামলার রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সেবায়েতের হাতে বাগানের জমি তুলে দেওয়া হয়। এখন সেখানে কৌশলে চলছে নানা কর্মকাণ্ড।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খাদিম চা বাগানের ১১৪২ ও ১১৫৫ দাগের অনেক জমি লুটপাট করা হয়েছে। দেবপুর মৌজা, বহর মৌজা, টিলাগড় মৌজা, খাদিমনগর মৌজা, খিদিরপুর মৌজা ও আটগাঁও মৌজায় সরকারি খাসজমির পাশাপাশি ওই চা বাগানের জমি দখল হয়ে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চা বাগানের আশপাশে রয়েছে খাসজমি। কিছু এলাকায় খাসজমিতে বাস করছেন ১৯৬৪ সালে ভারত থেকে আসা মোহাজিররা। তাদের সরকারিভাবে থাকার জন্য খাদিম, বাহুবলসহ বিভিন্ন এলাকায় মোহাজির কলোনি তৈরি করে দেওয়া হয়। বর্তমানে অনেক খাসজমি মোহাজিরদের দখলে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা লোকজন ও মোহাজিররা মিলে খাদিমপাড়া ও খাদিমনগর এলাকায় গড়ে তুলেছে বিশাল সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরাই সরকারের খাসজমির পাশাপাশি বিক্রি করে ফেলছে চা বাগানের জমি। অনেক বাগানের কর্তৃপক্ষ বিষয়টির দিকে নজর দিচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরও জানান, মোখলেছুর রহমান, খন্দকার আনোয়ার হোসেন, কামরুল, মানিক মিয়া, শিবলু মিয়া, আইয়ুব আলী, সিরাজ মিয়া, আমির মিয়া, উছমান আলী, কয়েস মিয়া, রুস্তম আলী, ইউনুছ আলী, সাইফুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, আবুল কালাম আজাদ পাটোয়ারী, আলী মুসলিম মিয়াসহ তাদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই বিক্রি হচ্ছে সরকারের লিজ দেওয়া চা বাগানের জমি।
স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন মৌজার জায়গা ও চা বাগানের অংশ ধীরে ধীরে কেটে দখল ও বিক্রি করা হচ্ছে। এ জন্য ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তার মাধ্যমে কিছু জাল কাগজও তৈরি করেছে ওই চক্র।
কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১১ সালে খাদিমনগর টি গার্ডেন মৌজার জেএল নম্বর সাবেক ৭১, হাল ৭১ ও দেবপুর মৌজার জেএল নম্বর সাবেক ৯৬, হাল ৮১-এ ইজারাধীন জমি সর্বমোট ১৮০১ একর ৫৬ শতক। ওই জমি নীনা-আফজাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের আফজাল রশীদ চৌধুরীকে ২০১২ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের জন্য ইজারা দেয় জেলা প্রশাসন।
এ ব্যাপারে খাদিম চা বাগানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফজাল রশীদ চৌধুরী জানান, ভূমিখেকো চক্র নানা অপকর্ম করছে। পুলিশ, ইউএনও, সিলেট বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তর ও ডিসি অফিসে অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাছরীন আক্তার বলেন, আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ দিলে আমরা ব্যবস্থা নেব। কয়েক বছর আগে গোয়াইনঘাটের ফতেহপুর চা বাগানের জমি দখল করা হয়। পরে ওই জমি অভিযান চালিয়ে দখলমুক্ত করে জেলা প্রশাসন। এখনও বাগানের বেশ কিছু জমি দখল করে রেখেছে ভূমিখেকোরা।
গেল বছর মৌলভীবাজারের বড়লেখার সাবাজপুর চা বাগানের ৫৫০ একর জমি দখলের চেষ্টা চালায় চক্রটি। এর আগে ২০১৬ সালে একইভাবে বাগানের আরেকটি অংশ দখলের চেষ্টা হয়। পরে প্রশাসন অভিযান চালিয়ে তাদের উচ্ছেদ করে। বেশ কিছু জমি এখনও দখলে রয়েছে।
মৌলভীবাজারের রাজনগরের উত্তরভাগ ও ইন্দানগর চা বাগানের জমি দখল-পাল্টা দখলের মধ্যে আছে। এসব ঘটনায় থানায় মামলাও চলছে। পলিমার এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মালিকানাধীন বাগান কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রায় ৩ হাজার ৮৮২ একর ভূমি নিয়ে অবস্থিত এ চা বাগানে স্থানীয় বড়দল, হলদিগুল, পূর্বখাস, পশ্চিম খাস, ইন্দানগর পান পুঞ্জি ও ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকার ভূমিখেকোরা বছরের পর বছর শতাধিক ঘরবাড়ি তৈরিসহ যত্রতত্র রাবার বাগান ও আনারস বাগান করেছে।
নাম প্রকাশ না করে বাগানের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, তাদের দুটি বাগানের ৫০০ একর জমি এখনও হাতছাড়া হয়ে আছে। এর মধ্যে দেড়শ একর জমিতে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে।




















