হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর অন্যতম সহচর হযরত চাষনীপীর (রহ.)-এর মাজারের টিলা কৌশলে কেটে দখল করে নিচ্ছে একটি চক্র। দীর্ঘদিন ধরে অল্প অল্প করে কাটা হচ্ছে টিলার মাটি। তারপর কাটা অংশ দখলে নিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত কাঁচা ও আধাপাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এভাবে চললে একসময় বিলীন হয়ে যাবে নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই টিলা।
প্রচলিত আছে, হযরত শাহজালাল (রহ.) যে মাটি ইয়েমেন থেকে নিয়ে এসেছিলেন তার সঙ্গে সিলেটের মাটির সাদৃশ্য শনাক্তকারী ছিলেন চাষনীপীর। নগরের গোয়াইটুলা এলাকায় যে টিলায় তাঁর মাজার, সেটিই চাষনীপীরের টিলা নামে পরিচিত। বন-জঙ্গলে আচ্ছাদিত এই টিলায় কয়েক শ বানরের বসতি থাকায় এটি বানরের টিলা নামেও পরিচিত। এক একর ৭৮ শতকজুড়ে বিস্তৃত এই টিলা।
এরই মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশ কেটে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মাজারের পশ্চিম-উত্তর অংশে ৫০০ ফুটের বেশি এলাকাজুড়ে চলছে টিলা কাটা। যন্ত্রের ব্যবহার না করে শ্রমিক দিয়ে কয়েক দিন পর পর রাতের বেলায় অল্প অল্প করে কাটা হচ্ছে মাটি। কোথাও কোথাও সদ্য মাটি কাটার তাজা ক্ষত, কোথাও ক্ষত বেশ পুরনো।
টিলাজুড়ে ঘন বন-জঙ্গল থাকায় অনেক ক্ষেত্রে মাটি কাটা অংশ গাছপালার আড়ালে ঢাকা থাকে।
পশ্চিম-উত্তর অংশে যেখানে টিলার সীমানা শেষ, সেখানেই শুরু পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মালিকানাধীন কালাপাথর মাঠ। পাউবো কয়েক বছর আগে সীমানাপ্রাচীর দিয়ে নিজেদের জমি আলাদা করার উদ্যোগ নেয়। অসম্পূর্ণ এই সীমানাপ্রাচীর ধরে খেয়াল করলে খুব সহজেই চোখে পড়ে, কতটুকু দখল হয়েছে চাষনীপীরের টিলা।
স্থানীয়রা জানায়, কয়েক বছর ধরে এভাবে টিলা দখলে নিয়েছে চক্রটি।
কাঁচা ও আধাপাকা স্থাপনা তৈরি করে কলোনির মতো করা হয়েছে। রিকশাচালক, ঠেলাচালকসহ শ্রমজীবীরা এখানে বসবাস করছেন।
কারা টিলা কাটছে? এসব স্থাপনার মালিকই বা কারা? এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে চায়নি এখানকার বাসিন্দারা। নানাভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল, তিন ভাই এরশাদ, আজাদ, শুক্কুর ও সোনা মিয়া, আলমাস ওরফে বাট্টি আলমাস, আবুলসহ কয়েকজন এসবের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের মদদদাতা জনৈক কুতুব উদ্দিন। কলোনির ভাড়া থেকে তাঁদের মাসে আয় লাখ টাকা। কলোনির আড়ালে মাদক, দেহ ব্যবসার মতো অবৈধ ব্যবসারও অভিযোগ রয়েছে।
মাজারের মুতাওয়াল্লি আব্দুর রব রউজ গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেট মহানগর পুলিশের বিমানবন্দর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সেখানে মৃত সফর উল্লার ছেলে সোনা মিয়া (৫০), আলকাছ মিয়া ওরফে বাট্টি আলকাছ (৫৫), মক্তার মিয়ার ছেলে আবুল (৫২) এবং কটাই মিয়ার ছেলে খসরুর (৫০) নাম উল্লেখ করে আরো দুই-তিনজন অজ্ঞাতপরিচয়কে অভিযুক্ত করা হয়। জিডিতে বলা হয়, অভিযুক্তরা মাজারের সীমানার ভেতর ঘর নির্মাণ করে নারীদের দিয়ে দেহ ব্যবসাসহ মাদক ব্যবসায় লিপ্ত।
মুতাওয়াল্লি আব্দুর রব বলেন, ‘থানায় লিখিত অভিযোগ করার সপ্তাহখানেক পর আম্বরখানা ফাঁড়ির ইনচার্জ একবার এসে পরিদর্শন করে গেছেন। এরপর ছয় মাস পার হলেও কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। স্থানীয় জনৈক কুতুব অভিযুক্তদের মদদ দেন।’
মুতাওয়াল্লি আরো বলেন, ‘থানায় অভিযোগের কাগজ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাকে এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে দৌড়ানো হলেও কোনো কক্ষেই স্যারদের পাইনি। কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানালেও তাঁরা গাছাড়া ভাব দেখান। বলেন, এসব তো আইনের কাজ, আইন করবে। আমাদের তো বন্দুক নেই। পরে একটি ফরম দিয়ে বলেন পূরণ করে নিয়ে আসতে। আমি উৎসাহ হারিয়ে ফেলি।’
এ বিষয়ে সিলেটের বিমানবন্দর থানার ওসি মোহাম্মদ নুনু মিয়া বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তাঁরা যদি আবার অভিযোগ করেন বা আমাকে বিষয়টি অবগত করেন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।’
অভিযুক্তদের অন্যতম বাবুল মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এগুলো দলিলের জায়গা। জায়গার মালিক ফজলু মিয়া, আমি কেয়ারটেকার। টিলা আগে কাটা হয়েছে, মাজারের মুতাওয়াল্লি প্রশাসন নিয়ে বাধা দিলে আর কাটা হয়নি।’ ভেতরে অবৈধ ব্যবসার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।
মাজারের টিলা কেটে কলোনি বানানো প্রসঙ্গে ফজলু মিয়া বলেন, ‘আমার দলিলের জায়গা, এটা ঠিক। মাজার যখন এ জায়গা পেয়ে যায়—তখন আমরা মাজারকে জমি ছেড়ে দিয়েছি। উচ্ছেদ করতে চাইলে করুন, অসুবিধা নেই।’
স্থানীয়রা বলছেন, টিলা কাটায় সঙ্গে উজাড় হচ্ছে বনের গাছপালা। এতে বানরের আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফলে নিরুপায় বানরের দল প্রায়ই লোকালয়ে এসে হামলা চালাচ্ছে। মানুষের খাবার-কাপড় নিয়ে যাচ্ছে। আহতও হচ্ছেন অনেকে। এসব এলাকার মানুষ বানর আতঙ্কে দিন কাটান।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, ‘সিলেটে যেভাবে টিলা নিধন চলছে, কয়েক বছর পর আর টিলা খুঁজে পাওয়া যাবে না। পীরের মাজারের টিলাও যেখানে অনিরাপদ, সেখানে অন্যগুলোর অবস্থা কী ভেবে দেখুন।’
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বদরুল হুদা বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই। অভিযোগ বা তথ্য পেলে আমি ব্যবস্থা নেব।’ মাজার কর্তৃপক্ষ পরিবেশ অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে গিয়েও সহযোগিতা পাননি। এ বিষয়ে তিনি জানান, এ রকম কিছু তাঁর জানা নেই।




















