স্বাস্থ্যসেবামূলক যন্ত্রপাতি আমদানিকারক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেডে পুকুরচুরির ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে কর্মরত অবস্থায় দুই উপ মহা-ব্যবস্থাপক (ডিজিএম) রবিউল করিম (৪৫) ও শান্তনু কুমার দাশ (৪৬) প্রতিষ্ঠানটির ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিষ্ঠানটির অন্য কর্মকর্তারা জানান, মাত্র ২৭ মাস ৮ দিন চাকরিকালে ওই দুই উপ মহা-ব্যবস্থাপক কোম্পানির প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাতের পাশাপাশি পরস্পরের যোগসাজশে আরও প্রায় ৩০ কোটি টাকার ক্ষতি সাধন করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোম্পানির সুনাম ও আর্থিক ক্ষতি করে এই দুই কর্মকর্তা নিজেদের নামে ও বেনামে কিনেছেন একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, গাড়ি, প্লট ও জমি-জমা। তাদের ব্যাংক হিসাবেও মোটা অঙ্কের টাকার খোঁজ মিলেছে।
সম্প্রতি দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান থানা পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। এরপর তাদের এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাগারে পাঠিয়েছে।
মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেডের একাধিক কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাকে জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে রবিউল করিম ডিজিএম পদে যোগদান করেন ২০১৮ সালের পহেলা অক্টোবর ও শান্তনু কুমার যোগ দেন ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল। ২০২১ সালে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী হাসান মাহমুদের মৃত্যু হয়। তার শূন্যতায় প্রতিষ্ঠানের প্রধান অভিভাবক হয়ে যান এই দুই কর্মকর্তা। কোম্পানির উত্তরাধিকারীরা সরল বিশ্বাসে এই দুই কর্মকর্তার ওপর সরকারি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবামূলক যন্ত্রপাতি সরবরাহের কাজ দেখাশোনার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই সরলতার সুযোগ নিয়ে ও বিশ্বাস ভঙ্গ করে রবিউল করিম ও শান্তনু কুমার দাশসহ তাদের সহযোগীরা অনিয়ম ও দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এ সময় চাকরিদাতা কোম্পানিকে না জানিয়ে তারা নিজেরাই একাধিক প্রতিষ্ঠান খুলে বসেন। মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেডে চাকরিরত অবস্থাতেই পদ-পদবি ব্যবহার করে ও প্রতিষ্ঠানটির ভুয়া প্যাড, সিল-স্বাক্ষর ব্যবহার করে তারা নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি শুরু করেন, যার প্রমাণ পরবর্তীতে পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের নাম, সুনাম, যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এবং ভুয়া প্যাড, ভুয়া নথি-দলিল বানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অগোচরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন এই দুই পদধারী কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রবিউল করিম ও শান্তনু কুমার দাশ দুইজনই নির্ধারিত বেতনে চাকরি করতেন মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেডে। তবে ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মারা যাওয়ার পর থেকে ২০২৪ সালের পহেলা এপ্রিল পর্যন্ত ২৭ মাস ৮ দিন চাকরিকালে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। বিষয়টি ধরা পড়ে চলতি বছরের পহেলা এপ্রিল। ওই দিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিরক্ষা ক্রয় মহাপরিদপ্তরের একটি কারণ দর্শানো নোটিশ কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর।
ওই নোটিশ পাওয়ার পর মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেড কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, তাদের প্রতিষ্ঠানের দুই ডিজিএম রবিউল ও শান্তনু কর্মরত থাকা অবস্থায় সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ও সরকারি সংস্থার কাছে তথ্য গোপন করে প্রতারণা ও টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে দ্য ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল নামে পৃথক টেন্ডারে অংশগ্রহণ করেন। একই সঙ্গে ওই প্রতিষ্ঠানটির সিইও ও ব্যবস্থাপনার অংশীদার হিসাবে স্বাক্ষর করেন রবিউল। এ ছাড়া তিনি প্রযুক্তি ইন্টারন্যাশনাল নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। ডিজিডিপির নোটিশ আসার পর মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেড কর্তৃপক্ষ আরও জানতে পারে, রবিউলের সঙ্গে একই কোম্পানির শান্তনু কুমার দাশও পৃথক টেন্ডার জমাদান প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত রয়েছেন। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে খোঁজ করে এই দুই কর্মকর্তার আরও বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ পায় কর্তৃপক্ষ।
মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেডের কর্মকর্তারা জানান, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রথমেই অনিয়মের বিষয়টি ধরে ফেলে। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের জবাব চেয়ে পরপর তিনবার চিঠি পাঠানো হয়। তবে প্রত্যেকবারই এমডির স্বাক্ষর জাল করে সেই চিঠির উত্তর দেন রবিউল ও শান্তনু কুমার দাশ। দ্বিতীয় চিঠিটি প্রতিষ্ঠানের ১৪ পুরানা পল্টন রেজিস্টার অফিসে এলে রবিউল করিম কৌশলে অফিস কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেনের কাছ থেকে অফিসে পৌঁছে দেবেন বলে জোর করে কেড়ে নেন । গত ঈদুল ফিতরের সময় এই দুই ডিজিএম ছুটি নিয়ে বাড়িতে গেলে তৃতীয় চিঠিটি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। সে সময়েই দুই ডিজিএমের প্রতারণার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের কাছে ধরা পড়ে। এ সময় মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেড কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কোনো চিঠিপত্র ইস্যু হলে ওই দুই কর্মকর্তা নিজেরাই যোগাযোগ করে কৌশলে তা গ্রহণ করতেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেড একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতির অসৎ উদ্দেশ্যে দুই অভিযুক্ত ডিজিএম পরস্পরের যোগসাজশে কোম্পানির লেটার হেড জাল করে, জাল স্বাক্ষর দিয়ে গত ১৩ এপ্রিল প্রতিরক্ষা ক্রয় মহাপরিদপ্তরে চিঠিও ইস্যু করেন। সেখানে রবিউল উল্লেখ করেন, তিনি কোম্পানির প্রতিনিধি হিসাবে আছেন।
শুধু তাই নয়, তথ্য গোপন করে রবিউল তার ব্যক্তিগত ও কোম্পানির অ্যাকাউন্ট নম্বর ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে। এ ছাড়া রবিউল ও শান্তনু দুজনে নিয়মিত গ্রাহকদের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করতেন এমন অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে তারা বেনামে কোম্পানির নামে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করলেও তা বাকির খাতায় দেখাতেন। কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের দুর্নীতি ধরা পড়লে এর হিসাব তারা দিতে পারেননি।
কোম্পানির পক্ষ থেকে অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এই দুজন কর্মকর্তা নির্ধারিত বেতনে চাকরি করলেও সবার অগোচরে অবৈধ উপায়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শান্তনু এই ২৭ মাস সময়ের মধ্যেই দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ি কিনে ফেলেছেন। এ ছাড়াও প্লটসহ বিভিন্ন জায়গায় নামে-বেনামে আরও জমি কিনেছেন।
আরও অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এই দুই কর্মকর্তা ‘দ্য ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল’-এর নামে টেন্ডারে অংশ নিতেন, যার সব খরচ বহন করতে হতো মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেডকে।
এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজার মো. মিজানুর রহমান বলেন, অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা অনেক দিন ধরেই আমাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে জানতে পেরেছি, তারা নিজেদের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ও তথ্য গোপন করে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কে জড়িয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়া পরোক্ষভাবে আরও ৩০ কোটি টাকার ক্ষতি সাধন করেছেন। জাল-জালিয়াতি ধরা পড়ার পরপরই মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের বরখাস্ত করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শেখ জাকির হোসেন গত ২৪ এপ্রিল তাদের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা করেন। সেই দিনই পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। ওই মামলায় পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে।
গুলশান থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম জানান, প্রতারণার মাধ্যমে কোম্পানির টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলায় রবিউল ও শান্তনুকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টির তদন্ত চলছে।
গুলশান থানা পুলিশ জানায়, রবিউল করিম মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেডে চাকরিকালীন তথ্য গোপন করে ‘দ্য ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল’, বাংলাদেশ সাইন্স হাউজ ও প্রযুক্তি ইন্টারন্যশনাল নামে তিনটি এবং শান্তনু কুমার দাশ নোরামেড লাইফ সাইন্স নামে কোম্পানি খোলেন। এরপর মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেডের নামে আসা সব কাজ তারা কৌশলে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়ে যেতেন এবং সেখান থেকে কাজগুলো করতেন। এভাবে অল্পদিনেই প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত টাকায় রবিউল করিম রাজধানীতে বিলাসবহুল ৪টি ফ্ল্যাট, রংপুরে বাগানবাড়ি, নাটোরে ৫০ বিঘা জমি কেনেন। শান্তনু কুমার দাশও রাজধানীতে কেনেন ২টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, ২টি প্লট, গাড়ি। এ ছাড়া তাদের অ্যাকাউন্টে মোটা অঙ্কের টাকাও পাওয়া গেছে।
এত অল্প সময়ে এত অর্থ-সম্পত্তির মালিক কীভাবে হলেন তদন্তকারী কর্মকর্তাদের এমন প্রশ্নের মুখে তারা কোনো সঠিক উত্তর দিতে পারেননি বলে জানান তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেড জানায়, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান মাহমুদ চৌধুরী জীবিত থাকাকালেও চেক জালিয়াতির কারণে অভিযুক্ত উভয় কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়া হয়। এ ছাড়া গ্রেপ্তার হওয়ার এক সপ্তাহ আগেও কোম্পানির একটি চেক জালিয়াতি করতে গিয়ে তারা ধরা পড়েন।
এ কারণে মেডিগ্রাফিক ট্রেডিং লিমিটেড-এর মালামালসহ যে কোনো ধরনের কাজে এই দুই অসৎ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ বা লেনদেন না করার জন্য গ্রাহকদের সতর্ক করা হয়েছে।




















