‘বুঙ্গার’ চিনির নিরাপদ রুট সিলেট!

  • প্রকাশের সময় : ১৪/০৭/২০২৪ ০৭:৩৭:২৩ AM

ছবি-সংগৃহীত

Share
53

‘বুঙ্গার’ চিনির এখন নিরাপদ রুট সিলেট। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বানের পানির মতোই ভারত থেকে আসা চিনির চালান সিলেট নগরী হয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ‘বুঙ্গার’ চিনি ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। প্রতিদিনই ধরাও পড়ছে ছোট বড় একাধিক চালান। কিন্তু চোরাচালানের মূলহোতারা অর্থাৎ ‘বুঙ্গাড়িরা’ রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। উল্টো ‘বুঙ্গার’ কারবারে গতি বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে তুলছে নতুন নতুন সিন্ডিকেট। বিভিন্ন রুটে নিয়োগ করা হয়েছে নতুন সোর্স ও লাইনম্যান। এছাড়া ধরা পড়া চিনি যাতে সিন্ডিকেটের বাইরের কেউ নিলামে কিনতে না পারে-সেজন্য মোট অংকের অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রশাসনকে ম্যানেজ করতেও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে কয়েকদিন ধরে ‘বুঙ্গাড়ি সিন্ডিকেট’ নগরীর ধোপাদিঘীরপাড় এলাকায় বৈঠক করছেন। নতুন ‘বুঙ্গাড়ি’ সিন্ডিকেটে যুক্ত হয়েছেন কানাডা ফেরত এক সাবেক ছাত্রনেতাও। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাতারাতি ভাগ্য বদলাতে ‘বুঙ্গায়’ ঝুঁকছেন সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট ও জকিগঞ্জের কয়েক শ’ মানুষ। এ তালিকায় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন। হালনাগাদ এ কর্মে যুক্ত হয়েছেন সিলেট নগরীতে অবস্থানরত কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও তাদের কর্মীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘বুঙ্গাড়িদের’ ধরার চেষ্টা করলেই চাপ-তদ্বির শুরু হয়। ম্যানেজও চলে নানা প্রক্রিয়ায়।

সীমান্তের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সীমান্তে শত শত ‘বুঙ্গাড়ি’ থাকলেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করে একজন। ‘বুঙ্গাড়িদের’ কাছে তিনি আবুল মহাজন হিসেবে পরিচিত। কয়েক বছর আগেও তিনি জাফলং এলাকায় তেল বিক্রি করতেন। পেট্টোলপাম্প থেকে বাকীতে নেয়া তেলের টাকাও পরিশোধ করতে পারেননি। মামলায় কারাভোগও করেছেন। এখন তিনি টাকার ‘কুমির’। ‘বুঙ্গায়’ ভাগ্য বদলেছে তার। এখনও ‘বুঙ্গার’ কারবারে তার কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ আছে। তার ইশারায় চলে ‘বুঙ্গার’ লাইন। সব মহলেই তার যাতায়াত। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পিয়াইন নদী, ডাউকি নদী, জিরো পয়েন্ট, লামাপুঞ্জি, গুচ্ছগ্রাম, সংগ্রামপুঞ্জি, তামাবিল, নলজুরী দিয়ে ভারতীয় ‘বুঙ্গার’  চিনি প্রবেশ করে। বন্যার আগে এসকল সীমান্ত দিয়ে আসা ‘বুঙ্গার’ চিনির চালান হাদারপাড়ে নেওয়া হতো। এরপর ট্রাক, পিকআপ কিংবা অন্য ছোটো যানবাহনের মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া হতো হরিপুরে। আর বন্যায় গোটা উপজেলা প্লাবিত থাকায় বর্তমানে সীমান্ত থেকে সরাসরি নৌকাযোগে চোরাচালান নিয়ে যাওয়া হয় জৈন্তাপুরের হরিপুরে। জৈন্তাপুর উপজেলার মোকামপুঞ্জি, আলুবাগান শ্রীপুর। আদর্শগ্রাম, মিনাটিলা, কেন্দ্রী, ডিবির হাওর, আসামপাড়া, টিপরাখলা, করিমটিলা, নয়াগ্রাম, অভিনাশ টিলা, বাঘছড়া, রাবারবাগান, বালীদাঁড়া সীমান্ত এলাকা দিয়েও আসে ‘বুঙ্গার’ চিনি। 

এছাড়া কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উত্তর রনিখাই ইউনিয়নের বরম সিদ্ধিপুর, মাঝেরগাঁও, উৎমা, লামাগ্রাম, নারাইনপুর, চিকাডহর ও ছনবাড়ি দিয়েও ‘বুঙ্গার’ চিনির চালান আসে। অপরদিকে কানাইঘাট সীমান্ত এলাকা এখন ‘বুঙ্গার’ চিনির নিরাপদ রুট। এই উপজেলার সুরইঘাট সুনাতনপুঞ্জি, বাউরবাগ ২য় খণ্ড, বাউরবাগ ১ম খণ্ড, নয়াখেল, বড়বন্দ, লোভা, নুনছড়া আলুবাড়ী, নিহালপুর ও নিহালপুর আমরতল দিয়েও আসে ‘বুঙ্গার’ চিনি। ট্রাকভর্তি করে সিলেট নগরী হয়ে ‘বুঙ্গার’ চিনি যায় পাবনা ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বিশেষ করে পাবনা হচ্ছে ‘বুঙ্গার’ চিনির বড় মার্কেট। 

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্তি উপকমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, চোরাচালান ঠেকাতে মহানগর এলাকায় নিয়মিত অভিযান চলছে। বিভিন্ন সড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে ৬টি থানা ও গোয়েন্দা পুলিশ। এর সুফলও মিলছে। ধরা পড়ছে একের পর একে চোরাচালান। গ্রেফতার করা হচ্ছে জড়িতদের। চলতি বছরের ৬ মাসে সিলেট জেলা ও  নগরীর বিভিন্ন থানায় চোরাচালানের ঘটনায় ৬১টি মামলা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ১৪৭ জনকে।

এসবের মধ্যে জৈন্তাপুর থানার একটি মামলার আসামি মনসুর আহমদ নিজপাট ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তার শ্যালক আবদুল কাদিরও এ মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।


সিলেট প্রেস / ১৪ জুলাই ২০২৪/ এফ কে


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৪-০৭-১৪ ০৭:৩৭:২৩