৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গনঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিলেটে প্রথম মামলা দায়ের হয় ১৯ আগস্ট সোমবার। এরপর থেকে শুরু হয় একের পর এক মামলা। ১৯ আগস্ট থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ২৩টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এই মামলাগুলোর বেশীরভাগ আদালতে দায়ের করা।
এসব মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী ওবায়েদুল কাদের, সালমান এফ রহমান, আসাদুজ্জামান খান কামাল, আনিসুল হক, হাসান মাহমুদ, শফিকুর রহমান চৌধুরী, সদ্য সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, সাবেক এমপি শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, হাবিবুর রহমান হাবিব, রনজিত সরকারসহ সিলেটে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সব নেতাদের আসামি করা হয়েছে। আসামি রয়েছেন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
১৯ আগস্ট : আন্দোলন চলাকালে ১৯ জুলাই সিলেটে পুলিশের গুলিতে নিহত সাংবাদিক এটিএম তুরাবের ভাই আবুল আহসান মো. আযরফ (জাবুর) বাদী হয়ে সোমবার (১৯ আগস্ট) সিলেট অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল। এজাহারে আসামি হিসেবে পুলিশসহ ১৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে ২০০ থেকে ২৫০ জনকে। শুনানি শেষে মামলার এফআইআর করার নির্দেশ দেয় আদালত।
১৮ জুলাই সন্ধ্যায় পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পানিতে পড়ে মারা যান সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ছাত্র রুদ্র সেন (২২)। এ ঘটনায় সোমবার (১৯ আগস্ট) সিলেট অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যঅ মামলা দায়ের করেন আন্দোলনের শাবি সমন্বয়ক হাফিজুল ইসলাম। মামলায় সাবেক সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেটের তিন সাবেক এমপিসহ ৭৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আরও ২০০-২৫০ জনকে।
সিলেট মহানগরীর শাহপরাণ (রহঃ) থানা একটি মামলা দায়ের করেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের মাখন দাশের ছেলে দিবাকর দাশ (২৬)। তিনি বর্তমানে নগরীর শিবগঞ্জ লামাপাড়া মোহিনী-৬৬ বাসায় বসবাস করন। মামলায় আসামি করা হয় সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাজমুল ইসলাম, ৩৬ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও সিলেট জেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, যুবলীগ নেতা সামাদ আহমেদ, কামরুল ইসলাম, সিলেট মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক দেবাংশু দাস মিঠুসহ ৪০-৫০ জন।
২০ আগস্ট : মহানগরীর সোবাহানিঘাট এলাকায় বিএনপি-যুবদল-ছাত্রদলের মিছিলে হামলা ও গুলি চালানোর অভিযোগে আদালতে মামলা করেন এক যুবক। মামলায় সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার, সিলেট সিটি করপোরেশনের সদ্য সাবেক মেয়র, সদ্য সাবেক তিন এমপিসহ ৫৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৩/৪০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। দক্ষিণ সুরমা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সাজন আহমদ সাজু সিলেটের অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন আদালতের বিচারক আব্দুল মোমেনের আদালতে এই মামলা দায়ের করেন।
২১ আগস্ট : সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৮৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ৪ আগস্ট সিলেট মহানগরের বন্দরবাজার এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের গুলি ও হামলার অভিযোগে সিলেট মেট্রোপলিট ম্যাজিস্ট্রেট ১ম ও দ্রুত বিচারিক আদালতে মামলাটি করেন মো. জুবের আহমদ (৩৫) নামের এক যুবক। মামলায় ৫০০-৬০০ জন অজ্ঞাত লোককে আসামি করা হয়েছে।
সরকার পতনের পর বিজয় মিছিলে হামলার অভিযোগে সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিয়ানীবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম পল্লবসহ ৭৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের কারা হয়। অজ্ঞাত রাখা হয়েছে আরও ১৫০ থেকে ২০০ আসামি।
বিশ্বনাথে গত ৪ আগস্ট পৌর শহরের পুরাণ বাজার এলাকায় জামায়াত নেতা ও আল-হেরা শপিং সিটির ব্যবসায়ী আমজদ আলীর উপর হামলার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়। আমজদ আলী বাদী হয়ে সাবেক প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরীকে প্রধান অভিযুক্ত করে মামলাটি দায়ের করেন।
২২ আগস্ট : গত ১৮ জুলাই সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গেইটসহ পুরো আখালিয়া এলাকায় ছাত্র-জনতার উপর 'হামলা, গুলি ও আহত'র ঘটনায় সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ৩য় আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি দায়ের করেন সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাও ইউনিয়নের অনন্তপুর গ্রামের আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ জুবেল আহমদ। মামলায় সিলেট জেলা, মহানগর ও সদর উপজেলার বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে আসামি করা হয়।
এদিন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীকে প্রধান আসামি করে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন হকার নেতা মো. রুহুল আমিন রুবেল। গত ২৩ জুলাই সিলেট মহানগরের লালদীঘিরপাড় (অস্থায়ী) হকার্স মার্কেটে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি দায়ের করেন তিনি।
একই দিন মহানগরের আম্বরখানা ও সাপ্লাই এলাকায় ছাত্র-জনতার অভিযোগে সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ১ম আদালতে মামলা দায়ের করেন ইলক্ট্রিক সাপ্লাই (কলবাখানি) ব্লক-এ এর জালালী-৬১ নং বাসার বাসিন্দা খোরশেদ আলম (৩০)। মামলায় তিনি সাবেক প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী ও এমপি শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলসহ ৪৭ জনের নাম উল্লেখ করেছেন। আরও আসামি করেন অজ্ঞাত ২০০-৩০০ জনকে।
নগরীর সেনপাড়া এলাকার জুবেল আহমদ স্বপন নামের এক যুবকের মামলায় আসামি হন সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্র্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, সিলেট মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মো. জাকির হোসেন খানসহ ৬৪ জন। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ৩০০/৪০০ জনকে।
৪ আগস্ট মহানগরের সোবহানীঘাট এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সংঠনের নেতাকর্মীদের হামলা-গুলিবর্ষণের অভিযোগে সিলেট অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন জুবেল আহমদ স্বপন।
এদিন আদালতে আরও দুটি মামলা হয়েছে। একটি গোলাপগঞ্জে ছাত্র-জনতা হত্যা ও অপরটি দক্ষিণ সুরমায় আন্দোলনকারীদের উপর হামলা-গুলির ঘটনায় আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।
২৫ আগস্ট : গোলাপগঞ্জে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও সাবেক সাংসদ নুরুল ইসলাম নাহিদকে প্রধান আসামী করে আরও দুটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। একটির বাদী ৪ আগস্টের সহিংসতায় নিহত ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের নিশ্চিন্ত গ্রামের তৈয়ব আলীর ছেলে নাজমুল ইসলামের (২৪) স্ত্রী খাদিজা মাহিরুল। অপর মামলার বাদী ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের দত্তরাইল গ্রামের নিহত মিনহাজের (২৩) এর বড় ভাই সাঈদ আলম। উভয় মামলায় প্রধান আসামি নুরুল ইসলাম নাহিদ।
২৭ আগস্ট : ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশছাড়ার পর সিলেটের গোয়াইনঘাটের মাতুরতল বাজার এলাকার সোনারহাট বিজিবি ক্যাম্পের সামনে আনন্দমিছিলে হামলা ও গুলি চালিয়ে সুমন মিয়া (২০) নামের এক তরুণ নিহতের ঘটনায় সিলেট জুডিসিয়্যাল ম্যাজিস্ট্রেট ১ম আদালতে মামলাটি দায়ের করেন নিহতের বাবা আব্দুন নুর বিলাল (৬৫)। তিনি গোয়াইঘাটের মাতুরতল বাজার এলাকার ফেনাইকোনা গ্রামের বাসিন্দা।
মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকজন আসামি হলেন- সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সিলেট-৪ আসনের সাবেক এমপি ও সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ, জেলা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান ইমাম উদ্দিন সাদেক ও ঘটনার সময়ের গোয়াইনঘাট থানার ওসি রফিকুল ইসলাম।
একই দিন গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগের দিন ৪ আগস্ট (রোববার) সিলেট মহানগরীর কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় হামলা-গুলির অভিযোগে সিলেট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ১ম আদালতে মামলা দায়ের হয়। নগরীর আরামবাগ এলাকার মৃত সিরাজ মিয়ার ছেলে বাবুল মিয়া বাদি হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন।
মামলায় তিনি সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের সদ্য সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সাবেক সাংসদ হাবিবুর রহমান হাবিবসহ ৪১ জনের নাম উল্লেখ করেছেন। আরও আসামি করেছেন অজ্ঞাত ২৫০-৩০০ জনকে।
২৭ আগস্ট : সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানায় আরেকটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ৪ আগস্ট উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ এলাকার বারোকোট গ্রামে পুলিশ-বিজির সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষের সময় গুলিতে রায়গড় গ্রামের সানি আহমদ নামের তরুণের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা মো. কয়ছর আহমদ বাদী হয়ে বুধবার (২৭ আগস্ট) থানায় মামলাটি দায়ের করেছেন।
মালায় প্রধান আসামি করা হয়েছে সিলেট-৬ আসনের সাবেক এমপি নুরুল ইসলাম নাহিদকে। উল্লেখযোগ্য কয়েকজন আসামি হলেন- সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খান, গোলাপগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র আমিনুল ইসলাম রাবেল, কানাডা আওয়ামী লীগের সভাপতি সরওয়ার হোসেন ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুর কাদির শাফি চৌধুরী এলিম।




















