দিনে স্টুডিওর দরজায় তালা। রাত নামার পর স্টুডিওর পরিচালক টাকাওয়ালা সৌখিন যুবকদের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে বলেন, ‘আজ রাতে ভালা শিল্পী ( সুন্দরী নারী কণ্ঠশিল্পী) আছে’। স্টুডিওর পরিচালক এভাবেই সিলেটের টাকাওয়ালা যুবকদের জড়ো করেন তার গানের রেকর্ডিং স্টুডিওতে। প্রকৃতপক্ষে এখানে কোনো গান রেকর্ড করা হয় না। প্রতি রাতে সুন্দরী নারী শিল্পীরা গান শুনিয়ে আগত এসব যুবকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। তাছাড়াও পর্দার আড়ালে চলে গাঁজা ও ইয়াবার ব্যবসা। সিলেটের এসএমপির দক্ষিণ সুরমার তেতলী, মোগলাবাজার থানার শিববাড়ি ও শাহপরাণ থানার কুশিঘাট বাজারে স্টুডিওর আড়ালে চলছে এ টাকা ও নেশার খেলা।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেলো, সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানাধীন সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের তেতলী পয়েন্টে ‘রাজ স্টুডিও’। এটি দিনেরবেলা বন্ধ থাকে। আশপাশে সুনসান নীরবতা, কোথাও কেউ নেই। কিন্তু রাত নামলেই রাজ স্টুডিওর সামনে গাড়ি চড়ে আসতে থাকেন প্রবাসী ও উঠতি বয়সী যুবকেরা। সেজেগুজে আসেন নারী কণ্ঠশিল্পীরা। স্টুডিওর ভিতরে প্রায় দুই শ চেয়ার। এসব চেয়ারে বসেন আগতরা। পছন্দের নারী শিল্পী গান শুরু করলে সৌখিন টাকাওয়ালা ব্যক্তি দৌড়ে চলে যাচ্ছেন মঞ্চে।
সেখানে শিল্পীকে (নারীকে) জড়িয়ে ধরছেন পুরুষ দর্শক। নেশা খেয়ে ওই সুন্দরী নারীর গানের তালে পকেটের টাকা বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছেন দুই হাতে। সিলেটে এভাবেই প্রতি রাতে টাকা উড়ে এই রাজ স্টুডিওতে। এসব স্টুডিওর নেশায় পাগল হয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন বহু ধনী ও ব্যবসায়ী পরিবারের পুরুষরা। মোগলাবাজার থানাধীন শিববাড়ি বাজারের ডিআর স্টুডিও এবং শাহপরাণ থানাধীন পূর্ব কুশিঘাট বাজারে সানজিদা স্টুডিওতে একই চিত্র পাওয়া গেলো।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেটের প্রবাসী ও ধনী পরিবারের যুবকদের টার্গেট করে একটি প্রতারক চক্র টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক অভিনব কৌশল বের করে। এই চক্রের তালিকায় রয়েছে ২০-৩০ জন সুন্দরী কণ্ঠশিল্পী। এসব সুন্দরীদের গানের কথা বলে জড়ো করতে ইনডোর স্টুডিও বানায় চক্রটি। এসএমপির দক্ষিণ জোনের তিনটি থানা এলাকায় এসব স্টুডিও বানানো হয়। দক্ষিণ সুরমা থানার তেতলী পয়েন্টে আলা উদ্দিন পরিচালিত সবচেয়ে বড় রাজ স্টুডিও। এখানে প্রতি রাতে দুই তিন শ লোক সমাগম ঘটে। যা এসএমপির সমাবেশ অনুমতি আইনের নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘন। মোগলাবাজার থানার শিববাড়ি বাজারের ভিতরে দিপু নামের ব্যক্তির পরিচালনায় রয়েছে ডিআর স্টুডিও। সেখানেও এরকম গানের নাম করে লোক সমাগম ঘটিয়ে যুবসমাজের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
এসব স্টুডিওর রঙিন অন্ধকার জগতে এসে অনেকেই নেশাসহ অনৈতিক কাজেও জড়িয়ে পড়ছে। শাহপরান থানাধীন পূর্ব কুশিঘাট বাজারের শেষ প্রান্তে সানজিদা স্টুডিও চালান জমির নামের ব্যক্তি। সেখানেও প্রতিরাতে টাকা উড়ে ও আগত লোকেরা নেশাসহ নানা অশ্লীলতায় বুঁদ হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় কিছু ব্যক্তিকে ম্যানেজ করে নির্মাণ করা হচ্ছে এসব যত্রতত্র অননুমোদিত স্টুডিও। পুলিশের মোবাইল টিমকে ‘চা নাস্তার টাকা’ বাবদ দুই হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে প্রতিরাতে। এর ফলে সিলেটে অনেকটা নীরবে প্রতিরাতে অন্তত এক বছর ধরে এই ‘স্টুডিওর অন্ধকার জগৎ’ চলমান আছে। দিনে এসব স্টুডিওর দরজায় তালা থাকে, যে কারণে এলাকার মানুষ এসব খবর জানেন না। রাতের আঁধারে শুরু রাতের অন্ধকারেই সাঙ্গ হয় এই রঙিন জগৎ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট স্টুডিও সূত্রে জানা গেছে, প্রতিরাতে ১৫ থেকে ২০ জন সুন্দরী নারী শিল্পী আসেন স্টুডিওতে। ধনী পুরুষদের নাচ-গানে খুশি করে তারা ইচ্ছা মতো টাকা হাতিয়ে নেন। এসব নারীদের কাছ থেকে স্টুডিও পরিচালক ৩ হাজার টাকা করে ‘স্টুডিও ভাড়া’ নেন। প্রত্যেক সুন্দরী নারী তার নিজস্ব কিছু টাকাওয়ালা পুরুষদের ফোনকল করে এখানে গান শুনতে নিয়ে আসেন।
এসব সুন্দরী শিল্পীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে অনেক পুরুষের ঘরসংসার নষ্ট হচ্ছে। স্টুডিওতে কোনো নারী দর্শক নেই। গান শোনান নারী শিল্পীরা, আর গান শোনেন শুধু টাকাওয়ালা পুরুষেরা। যারা বাতাসে টাকা উড়াতে পারেন, তারাই আসতে পারবেন এই অন্ধকার স্টুডিওতে। নেশাগ্রস্তরা আসেন স্টুডিওতে। তাদের জন্য স্টুডিওর পরিচালকের নিজস্ব কিছু মাদক কারবারিরা আশপাশেই থাকেন। মদ, গাঁজা ও বাবা ( ইয়াবা) বিক্রি করে কিছু গোপন মাদক বিক্রেতারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ধনী পুরুষ বলেন, দবন্ধুর কথায় একদিন স্টুডিওতে গেছলাম। একজন খুব সুন্দরী শিল্পীর গান শুনে ভালো লাগছিলো। বন্ধু কইলো, টাকা দে শিল্পীরে। পকেটের সব টাকা উড়াইয়া দিলাম। পরে আরেকজন শিল্পী আমার নাম ধরে গান গাইলো। তাকেও দেখে ভালো লাগলো। পকেটে টাকা নাই; পরে বিকাশে টাকা এনে ওই সুন্দরীর হাতে টাকা দিলাম’।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক যুবক বলেন, ওই মহিলারা স্টুডিওর মালিকের কাছ থেকে নম্বর নিয়ে আমাকে কল দেয়। আমি বাথরুমে ছিলাম, আমার ওয়াইফ কল ধরে শুনি মহিলা শিল্পী আমাকে কল দিয়েছে। এর পর থেকে আমার ঘরে অশান্তি। একটু রাত হলেই বউ ফোন করে বলে, ঘরে আসো। স্টুডিওর এক জায়গার মালিক বলেন, তারা ১০ লাখ টাকা ইনভেস্ট করে স্টুডিও বানাইছে। আমি শুধু জায়গার ভাড়া পাবো। কিন্তু আমি একজন সম্মানী মানুষ। আমাকে ভুল বুঝিয়ে জায়গা ভাড়া নেওয়া হয়েছে। আগে জানলে ভাড়া দিতাম না। দক্ষিণ সুরমা থানাধীন তেতলী পয়েন্টের রাজ স্টুডিওর পরিচালক আলাউদ্দিন। তিনি বলেন, ইউনিয়নের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে স্টুডিও চালাই। এ ধরনের লোক সমাগমে এসএমপির অনুমতি লাগে, এই বিষয়টা আমি জানি না। মোগলাবাজার থানার শিববাড়ি বাজারের ডিআর স্টুডিওর পরিচালক দিপু বলেন, সিটিএসবি বা এসএমপির কোনো পারমিশন আমাদের নাই।
শাহপরাণ থানাধীন পূর্ব কুশিঘাট বাজারের সানজিদা স্টুডিওর মালিক জমির আলী বলেন,আমি এলাকার মানুষ লইয়া স্টুডিও চালাই। আমার এখানে শুধু মানুষরা এসে গান শুনে, শিল্পীকে টাকা গিফট করে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসএমপির অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (সিটিএসবি) মো. আফজাল হোসেন বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে খবর নেওয়া হবে। সিলেটের সুস্থ সামাজিক পরিবেশের যাতে ক্ষতি না হয় এবং যুবসমাজরা যাতে অবক্ষয়ের দিকে না যেতে পারে, সেদিকে অবশ্যই পুলিশের সজাগ দৃষ্টি থাকবে। আমার জানামতে, এ ধরনের কাজে সিটিএসবি কখোনই অনুমতি দেয় না।
এসএমপির উপ পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, আমি দক্ষিণ সুরমায় নতুন যোগদান করেছি। এই এলাকার কিছু স্পেশাল চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে মাননীয় পুলিশ কমিশনার মহোদয় আমাকে পাঠিয়েছেন। আমি সে অনুযায়ী কাজ শুরু করেছি। অপরাধ স্পটে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছি। আশা করি, এসব অননুমোদিত স্টুডিওর লোক সমাগমের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




















