জিন্দাবাজার সড়কে সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে জুতার দোকানের পসরা। শুধু স্কুলের সামন নয়, ঐতিহ্যবাহী ক্বীনব্রীজের উপরেও বসে ভাসমান বাজার। এককথায় সিলেট মহানগরী এখন ভাসমান বাজার। নেই সড়কের কোনো শৃঙ্খলা। যানজট ও জনজটে পড়ে প্রতিদিন অতিষ্ঠ নগরবাসী। অভিযোগ রয়েছে, রহস্যজনক কারণে সিলেট সিটি করপোরেশনের অভিযানিক দল নীরব ভূমিকা পালন করছে। বন্দরফাঁড়ি ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিনে নগরী ঘুরে দেখা গেলো, জিন্দাবাজার থেকে চৌহাট্টা সড়কের দুপাশে জুতা,কাপড়সহ হরেকরকম পণ্যের ভ্যানগাড়ির দোকান বসানো হয়েছে। এসব দোকানে বিকিকিনির সময় লোক জড়ো হলে সড়ক অর্ধেক সরু হয়ে যায়। এতে গাড়ি ও পথচারীদের জটলার সৃষ্টি হয়। জিন্দাবাজার সড়কে যানজটের অন্যতম কারণ এসব ভাসমান বাজার।
হাসান মার্কেটের সামনের সড়ক দখল করে বসানো হয়েছে প্রায় দেড় শ ফলের দোকান। মধুবন মার্কেটের সামনের এই মোড়ে ফলের বাজার বসায় সড়কের শৃঙ্খলা একেবারেই ভেঙে পড়েছে। একই অবস্থা মধুবন মার্কেট থেকে করিম উল্লাহ পয়েন্ট পর্যন্ত। সড়কের উপর ফল ও সবজিরবাজার।
সিসিকের প্রধান ফটক থেকে হেডপোস্ট অফিসের সড়কের অর্ধেক চলে গেছে হকারের দখলে। এটা যেনো পোস্ট অফিসের বাজার। সড়কের উপরের এই ভাসমান বাজারে সবজি, শুঁটকি, পেঁয়াজ ও রসুন সব পাওয়া যায়। এমনকি মুরগীর কাটা কলিজাও বিক্রি হয়। এসব কিনতে সড়কের ভাসমান বাজারে মানুষ ভীড় করেন। তখন এই সড়কে তীব্র যানজট তৈরি হয়। তবুও সিসিক ও ট্রাফিক পুলিশের কোনো ভূমিকা নেই।
একসময় ক্বীনব্রীজের উপরে হালকা যানবাহন চলতো। ব্রীজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় পিলার বসিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু মোটরসাইকেল ও পথচারীরা ক্বীনব্রীজ পার হতে পারবেন। অথচ হকারদের কাছে ক্বীনব্রীজের কোনো ঐতিহাসিক মূল্য নেই। তাদের কাছে ব্রীজ হিসেবেও এটা কোনো গুরুত্ব পাচ্ছে না। অবস্থা দেখে মনে হবে, এ যেনো ক্বীনব্রীজের বাজার! এখানে তরমুজ থেকে মোবাইল সীম সবকিছুই কিনতে পাওয়া যায়। ক্বীনব্রীজের উপরে বাজার বসায় গাড়ি ও মানুষ চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্রীজের ঐতিহাসিক সৌন্দর্য বিনষ্ট হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু লাইনম্যান এসব ভাসমান বাজার থেকে টাকা তুলে। একেক জিনেসের একেক লাইনম্যান৷ প্রতিদিন একটি সড়কের লাইন থেকে ৭ থেকে ১৫ হাজার টাকা চাঁদা তুলেন এসব লাইনম্যান। জিন্দাবাজার সড়কে ল্যাংড়া কামাল ও হারুন নামের দুই ব্যক্তি টাকা তুলেন। হাসান মার্কেটের সামন থেকে উজ্জ্বল নামের এক যুবক টাকা তুলেন। এরকম করে প্রতি লাইনে একজন ব্যক্তি নিয়োগ করে দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ সুরমার বরইকান্দির মো. হুসাইন আসমান বলেন, 'ব্রীজ হলো মানুষ পারাপারের। হকাররা এটাকে বাজার বানাইলাইছে। ক্বীনব্রীজের উপর থেকে ভাসমান বাজার অপসারণ করা প্রয়োজন'।
নগরীর তালতলা এলাকার কবির মিয়া বলেন,' স্কুলের সামনে জুতার দোকান দেখলে মনে হয়, সিলেটে সিসিক ও পুলিশ নাকে তেল দিয়া ঘুমাইরা। তারা চোখ বন্ধ করে আছেন'।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগরীর লালদিঘিপাড় মাঠে হকারদের পুনর্বাসন করা হয়েছিল। সিটি কর্পোরেশন এই মাঠে কয়েকদফায় প্রায় ৩ কোটি টাকা খরচ করেছে। কিন্তু কোনো সুফল পাচ্ছেন না ভোগান্তির শিকার নগরবাসী। হকারদের নাম ভাঙিয়ে ডেভিল রকিব সিন্ডিকেট ব্যাপক লুটপাট ও দোকান পজিশন বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে পলাতক রয়েছে। মাঠের ভিতরে এখন অল্প সংখ্যক হকাররা ব্যবসা করছেন।
সরেজমিনে মাঠ ঘুরে দেখা গেলো, মাঠের প্রবেশের রাস্তার সঠিক সংস্কার হয়নি। তাই ক্রেতারা মাঠে প্রবেশ করতে চায় না। এছাড়াও টেকসই কোনো শেড নেই।
সিলেট মহানগর হকার্স ঐক্য কল্যাণ পরিষদের আহবায়ক মো. নজরুল ইসলাম বলেন,' মাঠের শেডসহ স্থায়ী পুনর্বাসন ছাড়া মাঠে হকাররা থাকতে চায় না। বিগত সময়ে আমরা হকাররা মাঠে গিয়ে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি। আমাদের দাবী, উপযুক্ত পুনর্বাসনের আগ পর্যন্ত হকারদের ফুটপাতে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হোক'।
এসএমপির উপ পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন,'এ বিষয়গুলো নিয়ে আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে আলাপআলোচনা হয়েছে। হকারদের বার বার বলা হচ্ছে, সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে। তাদের জন্য মাঠ দেওয়া হলেও তারা মাঠে যাচ্ছেন না, মাঠে নাকি ক্রেতারা যায় না। এখন আমরা তাদেরকে ক্রেতা কোথা থেকে এনে দেবো? '।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নিরাপত্তা ও প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এবং অভিযানিক টিমের প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ একলিম আবদীন বলেন, ' সিসিকের অভিযানিক দল নিয়মিত অভিযান করে ফুটপাত দখল মুক্ত রাখার চেষ্টা করছে। পুলিশ ও সিসিকের যৌথ উদ্যোগে ফুটপাতে অভিযান অব্যাহত থাকবে'।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ফারিয়া সুলতানা বলেন,' আজকেও ফুটপাতে অভিযান দিলাম। আমরা চেষ্টা করছি স্কুলের সামন, ক্বীনব্রীজের উপর -এসব জায়গা দখলমুক্ত রাখার। মানুষকেও এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। এসব জায়গায় হকাররা যাতে বসতে না পারে, সেজন্য স্কুল কর্তৃপক্ষকেও ব্যবস্থা নিতে হবে। সিলেট নগরীকে সুন্দর ও পরিস্কার রাখতে আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়েও এসব নিয়ে আলাপ হচ্ছে। আমাদের আন্তরিক চেষ্টা আছে, সবাইকে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতা করলে নগরী সুন্দর রাখা সম্ভব '।




















