পরিচালক, উপ-পরিচালক ও সহকারী পরিচালক ( ক্লিনিক্যাল কন্ট্রাসেপশন)- এই তিনজন কর্মকর্তার তিনটি গাড়ি একাই চালান ড্রাইভার অর্জুন সূত্রধর।
অথচ ওই অফিসে অন্য ড্রাইভারকে গাড়ি না দিয়ে বসিয়ে রেখে বেতন দেওয়া হচ্ছে। কারণ অনুসন্ধানে জানা গেলো, দেড় বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি পাম্পের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করে ইচ্ছেমতো গ্যাসের ইউনিট ও তেলের লিটার বসিয়ে অতিরিক্ত বিলের টাকা আত্মসাৎ করছেন চালক অর্জুন সূত্রধর ওরফে অঞ্জন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই পাম্পে কোনো গ্যাস-ই নাই! সিলেটের জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসে চলছে এই তুঘলকি কাণ্ড।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের উপপরিচালকের একটি সাদা পাজেরো গাড়ির ( ঢাকা মেট্রো ঘ ১৩-৮৩৭৬) চালক হলেন অর্জুন সূত্রধর। কিন্ত স্থায়ী বা অতিরিক্ত কোনো দায়িত্ব ছাড়াই সিলেট বিভাগীয় পরিবার পরিকল্পনা অফিসের পরিচালকের কালো রঙের জীপগাড়ি ( ঢাকা মেট্রো ঘ ১৫-০৭৬৪) চালান ড্রাইভার অর্জুন। বরাদ্দ না থাকায় এডিসিসির সিলভার রঙের গাড়ি (সিলেট মেট্রো ঘ ১১-০০৩৩) বন্ধ আছে। কিন্তু বিভিন্ন সময় প্রমোদ ভ্রমণে গাড়িটি ব্যবহার করেন চালক অর্জুন। একাই তিনটি গাড়ির দায়িত্ব নিয়ে বিরতি পেট্রোল
পাম্পের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করে অর্জুন তেল ও গ্যাসের ভুয়া বিলে সরকারি টাকা আত্মসাৎ করছেন বলে তথ্য প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে সংরক্ষিত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর মীরাবাজারের বিরতি ফিলিং স্টেশনে বিস্ফোরণ ঘটে। এ ঘটনায় ৯ জন লোক অগ্নিদগ্ধ হোন ও ঘটনাস্থলেই একজন মারা যান। ঘটনার পর থেকে আজ-অব্দি গ্যাস পাম্পটি বন্ধ আছে। অথচ এই বন্ধ পাম্প থেকে গ্যাস নিয়েছেন বলে বিল জমা দিয়ে পাম্পের সঙ্গে গোপন যোগাযোগে সরকারি টাকা নয়ছয় করছেন অর্জুন সূত্রধর । জিন্দাবাজার সড়কে জনবহুল এলাকা হওয়ায় জালালাবাদ পাম্পকে কোনো গ্যাস অনুমোদন দেয়নি বিস্ফোরক অধিদপ্তর। তাই ওই পাম্পে অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল থাকলেও গ্যাস নাই। কিন্তু অর্জুন সূত্রধর এই তেলের পাম্প থেকে গ্যাস নিয়েছেন বলে ভুয়া জ্বালানি ভাউচারে পাম্পকে দিয়ে নিজের ইচ্ছেমতো ইউনিট ও লিটার বসিয়ে বিল জমা দিয়ে চেক নিয়ে যাচ্ছেন। চলতি বছরে জানুয়ারি মাসে ডিডির গাড়ির জন্য জালালাবাদ পাম্প থেকে ২১০ ঘনফুট গ্যাস ও ৩০ লিটার তেল কিনেছেন ড্রাইভার অর্জুন। একইভাবে গত ফেব্রুয়ারী মাসে ২০৪ ঘনফুট গ্যাস ও ৩০ লিটার তেলের বিল এসেছে অর্জুনের। এসব অর্জুনের পরামর্শে পাম্পের দেওয়া ভুয়া জ্বালানি ভাউচার। ট্রেজারী শাখায় চেক হওয়ার পর পাম্পের সঙ্গে ভাগবাটোয়ারা করে অর্জুন গ্যাস ইউনিট বৃদ্ধি ও তেলের অতিরিক্ত লিটারের টাকা আত্মসাৎ করছেন।
নথিপত্র দেখে জানা গেছে, জানুয়ারি -ফেব্রুয়ারি মাসের দুটি গ্যাসের বিলে মোট ২৫ হাজার টাকার চেক নিয়েছে জালালাবাদ পাম্প। অথচ এই পাম্পে কোনো গ্যাসই নাই! এর আগের ডিডি ডা.লুৎফুন্নাহার জেসমিনের সময়ে ডিডির গাড়ি (ঢাকা মেট্রো ঘ ১৩-৮৩৭৬) ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে অর্জুন বিল জমা দিয়েছিলেন ৭৫ হাজার টাকা। ওই বিলটি সন্দেহজনক হওয়ায় বরাদ্দ না থাকার অজুহাতে আটকে দেওয়া হয়েছে। কারণ, জ্বালানি ভাউচারে 'প্রাইভেট 'লেখা রয়েছে। জেলা অফিসের কোনো বাস, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেট কার নেই। কিন্তু পাম্পের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করে এসব প্রাইভেট গাড়ির ইউনিট ও লিটার বসিয়ে ভুয়া জ্বালানি ভাউচার দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সাবেক ডিডি তপন কান্তি ঘোষ ও সাবেক ডিডি বিপ্লব বড়ুয়া বিল পাশ করেননি। বর্তমান ডিডি মো. নিয়াজুর রহমানকে দিয়ে অর্জুন বিল পাশের অপতৎপরতা চালাচ্ছেন। অভিযোগ আছে, নিয়োগ বাণিজ্যের টাকায় কেনা অর্জুনের মোটরসাইকেল (সিলেট মেট্রো ল ১২-৫২৭৩) চলে জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের সরকারি তেলের টাকায়।
নিয়োগ কেলেঙ্কারী : জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসে প্রতারণা করে কোটি টাকার ঘুস বাণিজ্যের অপরাধে সাবেক ডিডি ডা. লুৎফুন নাহার জেসমিন ও ভুয়া ঠিকানা ব্যবহারের অভিযোগে নিয়োগপ্রাপ্ত আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ৩০ জানুয়ারি দুদক সিলেটের সমন্বিত জেলা কার্যালয় বাদী হয়ে সিলেট মহানগর আদালতের সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে ১০ জনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করে। এর আগে কিছুদিন মামলাটি সিআইডি সিলেট অফিসের এসআই রিপন তদন্ত করেন। ২০২২ ও ২০২৩ সালের বিভিন্ন সময়ে এ নিয়োগ বাণিজ্যের ঘটনা ঘটে।
মামলায় সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী পরিচালক, সাবেক ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক (সাময়িকভাবে বরখাস্ত) লুৎফুন্নাহার জেসমিন এবং সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা সহকারী ও বর্তমানে প্রেষণে জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে নিযুক্ত বরুণ ছত্রীকে আসামি করা হয়। অন্য আসামিরা হলেন সরকারি চাকরিতে নিয়োগপ্রাপ্ত তাসলিমা আক্তার, তাহসিন মাসুমা কচি, শক্তি রানী পাল, স্নিগ্ধা বিশ্বাস, পূর্ণিমা নম, পলি রানী দাশ, মন্টি সরকার ও পপি দাশ।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ কেলেঙ্কারির ওই ঘটনার সময় বরখাস্তকৃত ডিডি ডা. লুৎফুন নাহার জেসমিনের গাড়ি চালক ছিলেন এই অর্জুন সূত্রধর। ভুয়া নিয়োগের আটজনের মধ্যে হবিগঞ্জের একজনসহ মোট তিনজনের নিয়োগে অর্জুন জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ডিডি জেসমিন পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ চলাফেরায় ছিলো ড্রাইভার অর্জুন। জেসমিন মামলার আসামী হয়েছেন, চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছেন। অথচ ডিডি জেসমিনের গাড়ি চালক আজও সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসে বহাল তবিয়তে আছেন। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আড়ালে থেকে গেছেন এই গাড়ি চালক অর্জুন সূত্রধর । অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়োগ বাণিজ্য করে রাতারাতি টাকাপয়সা কামিয়েছেন অর্জুন সূত্রধর। ২০২৩ সালে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ভিজিটর পদে স্ত্রীর চাকরির জন্য ১২ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন অর্জুন। স্ত্রী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও দুর্নীতির অভিযোগে ভিজিটর নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ওই ১২ লাখ টাকা কোথায় পেয়েছিলেন অর্জুন? ওই টাকা ফেরত নিয়ে পঞ্চগড় জেলা অফিসের এক কর্মকর্তার সঙ্গে তার দেনদরবার চলছে বলে অধিদপ্তরের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের একজন ড্রাইভার মোহাম্মদ আবুল কাশেম । তিনি বলেন,' আমি এবি ভ্যানের ড্রাইভার। বরাদ্দ না থাকায় আমার গাড়ি বন্ধ আছে। বর্তমানে বসে বসে বেতন পাই'।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিরীহ এক কর্মচারী বলেন, ' ডিডির ড্রাইভার অঞ্জনের (অর্জুন সূত্রধর) অনেক ক্ষমতা। সিলেট জেলার সকল অফিসের কর্মচারী তার জানাশোনা । এখন গাড়িতে বসে ডিডির কাছে বিষোদগার করে একজন কর্মচারীকে বদলিসহ নানা হয়রানি করছে অঞ্জন। আবার যেসব কর্মচারীদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছে, তাদের নানা অনিয়মের ব্যাপারে ডিডি ও ডাইরেক্টরকে ম্যানেজ করে নিচ্ছেন অঞ্জন'।
অনুসন্ধানে নিরীহ ওই কর্মচারীর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলো। সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের একজন কর্মচারী জোনাকি দাস। তিনি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ১৫ দিনের বহিঃ ছুটি নিয়ে কানাডায় গিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী, ১৬ দিন পর জোনাকি অফিসে এসে যোগদান করবেন, অথবা অফিস তাকে শোকজ করবে। কিন্তু চার মাস হয়ে গেলেও জোনাকির অবস্থান অফিস জানে না। অর্জুনকে টাকা দিয়ে জোনাকি ব্যাপারটা সামলে নিচ্ছেন বলে অফিসের একটি সূত্র জানিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জালালাবাদ পাম্পের এক কর্মকর্তা বলেন,' আগুন লাগার পর থেকে বিরতি পাম্পের ওপর মামলা হয়েছে। এখনও মামলা চলমান। যেকারণে আমাদের পাম্পে কোনো গ্যাস নাই। এতে আমাদের পাম্প অনেক লসে আছে। জিন্দাবাজারে আমাদের একই মালিকের জালালাবাদ পাম্পেও কোনো গ্যাস নেই। আমরা তাদেরকে বলেছি আপনারা পাম্প পরিবর্তন করতে পারেন। কিন্তু তারা অন্য পাম্প থেকে গ্যাস নিচ্ছে। আমরা শুধু জ্বালানি ভাউচার দিচ্ছি'।
অভিযোগ অনেকটা স্বীকার করে গাড়িচালক অর্জুন সূত্রধর অঞ্জন বলেন,' এটা আমার ভুল হয়েছে। জালালাবাদ অথবা বিরতি পাম্পে গ্যাস নেই, তবু তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে গ্যাসের জ্বালানি ভাউচার নিচ্ছি। তবে আমি কোনো অতিরিক্ত কোনো ইউনিট ও লিটার বসাইনি'। আর কাশেম ড্রাইভার একটু বয়স্ক হওয়াতে স্যারেরা আমাকে দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন'।
এ বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা সিলেট জেলার উপ-পরিচালক মো. নিয়াজুর রহমান বলেন,' গাড়ি সচল রাখতে অনেকসময় তেল ৩০ লিটার লাগে। কিন্তু যে পাম্পে গ্যাস নেই, সেখান থেকে গ্যাসের বিল জমার বিষয়টি শুনে আমি অবাক হলাম। আমি এ বিষয়ে খোঁজখবর নিবো'।
কাগজপত্রে অর্জুন সূত্রধর অঞ্জন পূর্বে জেলা অফিসের উপপরিচালকের গাড়িচালক ছিলেন। বিভাগীয় পরিচালক তাকে তার স্থায়ী ড্রাইভার হিসেবে পাশ করিয়ে নিয়েছেন। এসব বিষয়ে জানতে বিভাগীয় পরিবার পরিকল্পনা অফিসে গিয়ে পরিচালক মোহাম্মদ আমান উল্লাহ্কে অফিসে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে বারবার কল করলেও তিনি কল ধরেননি। পরিচয় দিয়ে কথা বলতে মোবাইল ফোনে একটি ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো যোগাযোগ করেননি।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রশাসন ইউনিট (পরিবহন) সহকারী পরিচালক ছেরাজ আহমদ দৈনিক নিরপেক্ষকে বলেন,' কোনো ড্রাইভার যদি গ্যাস ও তেলের জ্বালানি বিলে অনিয়ম করেন, তবে এর দায় সংশ্লিষ্ট অফিসার এড়াতে পারেন না। কারণ তার হাতে একটা লগ বই আছে এবং তিনিই জ্বালানি বিলের চেক পাশ করেন'।
অধিদপ্তরের অর্থ ইউনিটের পরিচালক মো. এনামুল হক বলেন,' অধিদপ্তর থেকে জ্বালানি বরাদ্দ দেওয়ার পর তা সঠিকভাবে ব্যবহার করার দায়িত্ব বিভাগীয় ও জেলা অফিসের। এখন অর্থ পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবে প্রশাসন'।
জানতে চাইলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) মীর সাজেদুর রহমান বলেন,' যে পাম্পে কোনো গ্যাসই নেই, সেখান থেকে গ্যাসের বিল জমা অবশ্যই অন্যায়। তিনটি গাড়ি একজন ড্রাইভারের দায়িত্বে থাকাটাও অস্বাভাবিক। দুর্নীতির দায়ে পলাতক ও বরখাস্তকৃত
ডিডি জেসমিনের ড্রাইভার হিসেবে কেনো তাকে বদলি করা হলো না-এসব বিষয় নোট করা হলো। শিগগিরই এ বিষয়ে তদন্ত করে বিভাগীয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে'।




















