অপরাধের স্বর্গ রাজ্যের সম্রাট শান্তিগঞ্জের ওসি আকরাম

  • প্রকাশের সময় : ০১/০৮/২০২৫ ০৭:২২:১৫ PM

Share
1299

অপরাধ প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিজেই অপরাধে স্বর্গ রাজ্য গড়ে তুলেছেন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আকরাম আলী। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাতকের জাউয়া ফাঁড়ি ইনচার্জ থেকে শান্তিগঞ্জ থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন পেয়ে অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের বরপুত্র হিসেবে তিনি পরিচিত পেয়েছেন শান্তিগঞ্জ জুড়ে। এছাড়াও ডেবিল হান্ট অপারেশনের নামে চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স বাণিজ্য, মাদক আস্তনায় নিয়মিত মাসোয়ারাসহ নিজ কার্যালয়ে মাদক সেবনের মতো জগন্য কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে ওসি আকরাম আলীর বিরুদ্ধে।

বেপরোয়া ওসি'র অপরাধের সহযোগী হিসেবে রয়েছেন থানার একাধিক এসআই, এএসাই ও পুলিশের সোর্স ও রাজনৈতিক দলের কথিত নেতা। সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট চক্রের মাধ্যমে দিনের পর দিন থানায় বসে চালিয়ে যাচ্ছেন অসৎ পন্থায় অর্থ বাণিজ্য। ওসি আকরামের এমন অপরাধের দৌরাত্ম্য দিনেকেদিন বাড়তে থাকায় অতিষ্ট ভুক্তভোগী মানুষজন। 

দুই সপ্তাহব্যাপী অনুসন্ধান ও সরেজমিনে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ওসি আকরাম আলী একজন পেশাদার মাদকসেবী। নির্দিষ্ট এজেন্টের মাধ্যমে গাঁজা সংগ্রহ করে তা নির্ধারিত স্থানে সেবন করে থাকেন। মাঝেমধ্যে গানের আসর বসান তার কার্যালয়ে। সার্বক্ষনিক নেশায় আসক্ত থাকায় থানায় আসা সেবাগ্রহীতারা বঞ্চিত হচ্ছেন কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রাপ্তি থেকে।

একাধিক সূত্র বলছে, টাকা ছাড়া কোনো মামলা বা জিডি গ্রহণ করেননা ওসি আকরাম। টাকা না পেলে দিনের পর দিন অভিযোগ ঝুলিয়ে হয়রানি করেন আইনী সেবা নিতে আসা লোকজনকে। এছাড়াও অভিযোগ তদন্তের নামে পক্ষে বিপক্ষে ঘুষ লেনদেন করে থাকেন। একটি ঘটনায় একাধিক অভিযোগ গ্রহণ করে উভয় পক্ষের কাছ থেকে নেন মোটা অঙ্কের টাকা। তার এমন অপরাধের অন্যতম সহযোগী থানার এসআই মিজানুর রহমান।

পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের আব্দুল মন্নান নামের এক ভুক্তভোগী জানান, আমার ভাতিজাকে কয়েকজন লোক মেরে আহত করেছে। অভিযোগ থানায় নিয়ে যাওয়ার একসপ্তাহে রেকর্ড করা হয়নি। থানায় গিয়ে ওসি সাহেবের সাথে দেখা করলাম। তিনি বলেন এই ধারায় মামলা রেকর্ড করা যাবে না। পরে এসআই এসে জানালেন ওসিকে ৩০ হাজার টাকা দিলে মামলা রেকর্ড হবে। ৫ হাজার টাকা দিয়ে কাকুতি মিনতি করলাম। এরপর এক সাংবাদিক দিয়ে রিকোয়েস্ট করার পরদিন মামলা রেকর্ড করেছেন ।

দরগাপাশা ইউনিয়নের আব্দুর রহমান জামী নামের এক গণমাধ্যমকর্মী বলেন, এলাকার এক যুবক আমাকে হত্যার হুমিকী দিলে আমি সহকর্মী এক সাংবাদিককে সাথে নিয়ে থানায় গিয়ো জিডি করি। জিডি করার পর স্বাভাবিকভাবে পুলিশ তদন্ত করার কথা থাকলেও ওসি সাহেব জানান এসআই মিজানের সাথে যেনো মিটমান করে ফেলি। সরাসরি টাকা চেয়ে বসেন তিনি। আমি রীতিমতো অবাক হলাম। আমি প্রথমে টাকা দিতে রাজি না হলেও পরে বাধ্য হয়ে দিতে হয়েছে। 

জায়গায় সম্পত্তি বিষয়ে একটি বিরোধ। থানায় মামলা দিতে যাওয়ার পর নানা ভাবে হয়রানি করা হয়েছে। ওসি জানাই দিছেন টাকা লাগবে।

এদিকে ডেবিল অপারেশনের নামে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর কাছ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া যায় ওসি আকরাম আলী বিরুদ্ধে। ওসি মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে গ্রেফতার এরিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরাফেরা করছেন নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। যাঁরা চাঁদা দিতে অস্বীকার করছেন তাদের গ্রেফতার করে হয়রানির অভিযোগও পাওয়া গেছে। 

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক বিএনপি নেতা বলেন, আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগ, কৃষকলীগের বড় বড় নেতারা উপজেলায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একাধিক প্রভাবশালী নেতা রয়েছেন যাঁরা সার্বক্ষণিক সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে অথচ ওসি তাদের গ্রেফতার করছে না। যতদূর জানি ওসি তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন।

অনুসন্ধান বলছে ওসি আকরাম আলী প্রবাস গমণে ইচ্ছুক যুবকদের কাছ থেক পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নামে জনপ্রতি সর্বনিম্ন ২০০০ টাকা থেকে ৫০০০ হাজার টাকা গ্রহণ করছেন। টাকা ছাড়া থানা থেকে ক্লিয়ারেন্স দেননা ওসি। তাই বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে ক্লিয়ারেন্স নেন লোকজন।

মারজান আহমেদ চৌধুরী নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, আমার ছেলের পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জন্য আমি সবকিছু অনলাইনে জমা দিয়েছি। ব্যাংকে টাকা পরিশোধ করেছি। তারপরও থানায় টাকা দিতে হয়েছে। আমি অবসরপ্রাপ্ত একজন ফায়ার সার্ভিস লিডার, তারপরও আমাকে টাকা দিয়ে ক্লিয়ারেন্স নিত হয়েছে।

গনিগঞ্জ গ্রামের মো.শামীম আহমদ বলেন, অনলাইনে সকল ডকুমেন্টস দিয়ে আমার ভাইয়ের জন্যে পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের আবেদন করেছিলাম। কোনো মামলা না থাকার পরও একমাস ক্লিয়ারেন্স থানায় আটকে রাখা হয়েছিল। থানা থেকে বার বার ফোন দেয়া হয়েছে থানায় গিয়ে খরচাপাতি দেয়ার জন্যে। ৫০০ টাকা দেয়ার পরও ক্লিয়ারেন্স না পাওয়ায় আমি সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ে গিয়ে যোগাযোগ করার পর একমাসে ক্লিয়ারেন্স পেয়েছি অযতা আমাকে হয়রানি করা হয়েছে। 

জানা যায়, গত ৩০ জুলাই রাতে শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের ঠাকুরভোগ গ্রামের আওয়ামীলীগ নেতা সিলেটের বৈষম্য বিরোধী মামলার আসামি আবদাল মিয়া শান্তিগঞ্জ থানার ১০৭ ধারার মামলায় গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত আবদাল মিয়াকে সিলেটের বৈষম্যবিরোধী মামলায় গ্রেফতার না দেখিয়ে শুধু ওয়ারেন্টভুক্ত ১০৭ ধারা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়। নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে সিলেটের বৈষম্য বিরোধী মামলা গোপন রাখতে আবদাল মিয়ার পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন ওসি আকরাম।

ঘুষ লেনদন ও অনিয়মের ব্যাপারে জানতে চাইলে অভিযুক্ত শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আকরাম আলী বলেন, আমার থানার অভিজ্ঞা এই প্রথম। আগে পুলিশের অন্যান্য ডিপার্টমেন্টে ছিলাম। কাজ করতে গিয়ে ত্রুটি হতে পারে । পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকবে এটা স্বাভাবিক। আমি নিজেও সামাল দিতে পারছি না। অনেক সমস্যা আছে। অনেক মামলার ওয়ারেন্ট রয়েছে, অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু পুলিশ মাঠ পর্যায়ে পাঠানো যাচ্ছে না। 

মামলায় টাকা লেনদেনের ব্যাপারে ওসি বলেন, ভুল ত্রুটি থাকতে পারে। সরাসরি জানালে বিষয়গুলো সমাধান হবে।


সিলেট প্রেস / ০১ আগস্ট ২০২৫/এফ কে


কমেন্ট বক্স
নিজস্ব প্রতিবেদক:

নিজস্ব প্রতিবেদক:

প্রকাশ: ২০২৫-০৮-০১ ১৯:২২:১৫