বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় কোচিং একটি স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রতিযোগিতা, সমাজের প্রত্যাশা এবং অভিভাবকদের চাপ, সব মিলিয়ে কোচিং আজ শিক্ষার্থীর জীবনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই নির্ভরতা যে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের অন্তর্নিহিত শক্তিকে দুর্বল করছে,তা অনেকেই উপলব্ধি করতে পারেন না। প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে নিজের সক্ষমতা আবিষ্কার করা, সমস্যা বিশ্লেষণ করা এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটানো। অথচ কোচিং-নির্ভরতা এই জায়গাগুলোকে দিন দিন সংকুচিত করে ফেলছে।প্রথমত, কোচিং শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। তারা আর নিজেরা অন্বেষণ বা অনুসন্ধান করতে শেখে না। প্রস্তুত করা নোট, সাজেশন এবং গাইডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে তাদের সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারা মুখস্থভিত্তিক শিক্ষায় অভ্যস্ত হয়ে যায়,যা দীর্ঘমেয়াদে জীবন-ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত, কোচিং-কেন্দ্রিক পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মাঝে একটি পরীক্ষা-নির্ভর মানসিকতা তৈরি করে। এখানে জ্ঞানার্জনের লক্ষ্য চাপা পড়ে যায় এবং কেবল ‘পরীক্ষায় কোন প্রশ্ন আসবে’—এই চিন্তাই প্রাধান্য পায়। এর ফলে তারা বাস্তবজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা থেকে বঞ্চিত হয়। এ ছাড়া কোচিং শিক্ষার আরেকটি বড় ক্ষতিকর দিক হলো আত্মবিশ্বাসের ক্ষয়। অনেক শিক্ষার্থী মনে করতে শুরু করে যে, কোচিংয়ের সাহায্য ছাড়া তারা কিছুই বুঝতে বা শিখতে পারবে না। তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও আত্মনির্ভরশীলতা হারিয়ে যায়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত কোচিং ফি পরিবারকে আর্থিক চাপে ফেলে, যা বিশেষ করে নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শিক্ষায় বৈষম্য তৈরি হয়। যারা বেশি কোচিং নিতে পারে তারা এগিয়ে যায়,আর যারা পারে না তারা পিছিয়ে পড়ে। আরও একটি গুরুতর প্রভাব হলো সময়ের অপচয়। স্কুল-কলেজের পড়া শেষ করেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কোচিংয়ে কাটাতে হয়, যার কারণে বিশ্রাম, খেলাধুলা,আনন্দ, পরিবার এমনকি নিজের শখগুলোও গুরুত্ব হারায়। এতে শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ বাড়ে এবং তাদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। একইভাবে নির্দিষ্ট একটি কাঠামোর মধ্যে পড়াশোনা করতে করতে নতুন কিছু শেখার আগ্রহও কমে যায়। গবেষণা,পাঠাভ্যাস বা স্বতঃস্ফূর্ত শেখার মতো গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো পিছিয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে কোচিং-নির্ভর শিক্ষা আমাদের শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের পথকে সংকুচিত করছে। তারা নিজেদের চিন্তা, সৃজনশীলতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা—এসব থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই প্রয়োজন একটি সমন্বিত শিক্ষানীতি, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজেই পর্যাপ্ত ও মানসম্মত শিক্ষা পাবে। শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজ—সবাইকে সচেতন হতে হবে যাতে কোচিং নয়, বরং প্রকৃত শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চাই হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীর পথপ্রদর্শক। প্রকৃত শিক্ষা স্বনির্ভরতা শেখায়, আর কোচিং-নির্ভরতা সেই পথকে ক্রমেই সংকুচিত করে দেয়। আমার পরবর্তী লেখায় কোচিং-নির্ভর শিক্ষার এই সংকট থেকে মুক্তির সহজ ও কার্যকর উপায়গুলো তুলে ধরা হবে।” লেখাটি সকল পাঠকদের পড়ার আহবান জানান।
মো: অলিউর রহমান
প্রভাষক, যুক্তিবিদ্যা
রাখালগঞ্জ কৈলাশ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ সিলেট।
যোগাযোগ: ০১৭১২৪২৪৫৪৭




















