৬ ইঞ্চির ডিসপ্লেতে বন্দি মানুষ

  • প্রকাশের সময় : ১৭/০৫/২০২৬ ০৬:১৯:৫১ PM

Share
22

১৯৫৪ সালের এক বৈজ্ঞানিক গবেষণা আজও যেন দেখিয়ে দেয় আধুনিক মানুষের অদৃশ্য আসক্তির ভয়ংকর বাস্তবতা

একসময় মানুষ দিনের শুরু করত পরিবারের সঙ্গে কথা বলে, পত্রিকার পাতা উল্টে কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে। বিকেল মানেই ছিল মাঠে খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। কিন্তু প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির এই যুগে মানুষের জীবন যত আধুনিক হয়েছে, ততই মানুষ ধীরে ধীরে বন্দি হয়ে পড়েছে একটি ছোট্ট স্ক্রিনের ভেতরে। আজকের বাস্তবতায় অনেকের জীবন যেন সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে মাত্র ৬ ইঞ্চির একটি ডিসপ্লেতে।

এই বাস্তবতাকে নতুনভাবে সামনে এনে দেয় ১৯৫৪ সালের একটি আলোচিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা। ওই বছর কানাডার James Olds এবং Peter Milner ইঁদুরের মস্তিষ্ক নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পরিচালনা করেন। গবেষণাটিতে তারা ইঁদুরের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম বা আনন্দ অনুভবের অংশে ইলেকট্রিক উদ্দীপনা প্রয়োগ করেন।

পরীক্ষার জন্য একটি বিশেষ খাঁচার মধ্যে রাখা হয় একটি ইঁদুর। সেখানে একটি বোতাম সংযুক্ত ছিল। ইঁদুরটি যখনই বোতামটি চাপত, তখন তার মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক সংকেত পৌঁছাত এবং সে প্রবল আনন্দ অনুভব করত। কিছু সময়ের মধ্যেই দেখা যায়, ইঁদুরটি বারবার সেই বোতাম চাপতে শুরু করে। এমনকি খাবার ও স্বাভাবিক প্রয়োজন উপেক্ষা করেও সে একই কাজ করতে থাকে।

বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, আনন্দ পাওয়ার এই প্রবল আকর্ষণ ইঁদুরটির আচরণ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। গবেষণাটি মূলত দেখিয়েছিল, মানুষের ও প্রাণীর মস্তিষ্কে আনন্দ ও পুরস্কার পাওয়ার প্রবণতা কতটা শক্তিশালী হতে পারে। পরবর্তীতে এই গবেষণা থেকেই ডোপামিন, আসক্তি ও আচরণগত নির্ভরতা নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার পথ তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ১৯৫৪ সালের সেই গবেষণার বাস্তব প্রতিফলন আজকের আধুনিক সমাজে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। পার্থক্য শুধু এতটুকু তখন ছিল একটি লাল বোতাম, আর এখন সেই জায়গা দখল করেছে স্মার্টফোনের স্ক্রিন।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শর্ট ভিডিও, অনলাইন গেম ও নোটিফিকেশন মানুষের মস্তিষ্কে ক্ষণিকের আনন্দ তৈরি করে। প্রতিটি লাইক, কমেন্ট কিংবা নতুন ভিডিও মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন ক্ষরণ ঘটায়, যা মানুষকে বারবার ফোন হাতে নিতে বাধ্য করে। ধীরে ধীরে এটি এক ধরনের মানসিক আসক্তিতে পরিণত হয়।

একই ঘরে বসেও পরিবারের সদস্যরা এখন আলাদা আলাদা স্ক্রিনে ব্যস্ত। খাবারের টেবিলে কথোপকথনের বদলে চলে স্ক্রলিং। বন্ধুত্ব সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে অনলাইন প্রতিক্রিয়ায়। বাস্তব সম্পর্কের জায়গা দখল করছে ভার্চুয়াল যোগাযোগ।

শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মাঠে খেলাধুলার বদলে তারা দীর্ঘ সময় কাটাচ্ছে মোবাইল ফোন ও ভিডিও গেমে। এতে শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারে অনিদ্রা, উদ্বেগ, হতাশা, মনোযোগের ঘাটতি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহারে চোখ, মস্তিষ্ক ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করার জন্য এসেছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তিই যখন মানুষের সময়, সম্পর্ক ও অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সেটিই হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য খাঁচা।

আজকের বাস্তবতায় তাই প্রশ্ন উঠছে আমরা কি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছি, নাকি প্রযুক্তিই ধীরে ধীরে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে? খাঁচাটি লোহার নয়, কাঁচেরও নয়। খাঁচাটি মাত্র ৬ ইঞ্চির একটি ডিসপ্লে।


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স

প্রকাশ: ২০২৬-০৫-১৭ ১৮:১৯:৫১