৬০ কোটির ঘুষ বাণিজ্য: বহাল তবিয়তে বিআরটিএর সুব্রত দেবনাথ

  • প্রকাশের সময় : ১৪/০৬/২০২৬ ০৫:৩৭:১৫ PM

Share
7

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর ঢাকা মেট্রো-৩ (উত্তরা দিয়াবাড়ী) কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সুব্রত দেবনাথের বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং গুরুতর প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া একটি লিখিত অভিযোগপত্র এবং ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে এই চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির চিত্র সামনে এসেছে।


অভিযোগে বলা হয়েছে, বিআরটিএ-এর এই কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন এবং সেই অর্থ ভারতে পাচার করেছেন।


চট্টগ্রাম সিএনজি প্রতিস্থাপনে ৬০ কোটি টাকার বাণিজ্য

অনুসন্ধান ও অভিযোগের সূত্রে জানা গেছে, সুব্রত দেবনাথ যখন চট্টগ্রাম বিআরটিএ-তে সহকারী পরিচালক (এডি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখন ২ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা প্রতিস্থাপনের নামে এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। চট্টগ্রামের ‘বিসমিল্লাহ মটরস’, ‘মেসার্স রাজামিয়া অ্যান্ড সন্স’, ‘জাফর অ্যান্ড কোং’, ‘শাহজালাল মটরস’, ‘এসবি কর্পোরেশন’, ‘ইমাম ডেইন্টিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’, ‘তাইফ মটরস’, ‘শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজ’ এবং নোয়াখালীর ‘আরকে অটোমোবাইল’ ও ‘তাসনিম ট্রেডার্স’সহ নির্দিষ্ট কিছু শোরুম মালিকদের সাথে আঁতাত করেন তিনি।

গ্রাহকদের সরাসরি সেবা না দিয়ে এই শোরুমগুলোর মাধ্যমে আসতে বাধ্য করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিস্থাপনযোগ্য প্রতিটি গাড়ি থেকে ৩ লাখ টাকা করে মোট ৬০ কোটি টাকা ঘুষ বাবদ হাতিয়ে নেন সুব্রত দেবনাথ। পরবর্তীতে সিএনজি মালিকদের তীব্র গণ-আন্দোলন ও প্রতিবাদের মুখে তাকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা মেট্রো সার্কেল-২-এ বদলি করা হয়।


ঢাকা মেট্রো সার্কেল-২-এ এসেও সুব্রত দেবনাথের ঘুষ ও অনিয়ম বন্ধ হয়নি। সেখানেও একই ধরনের বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়লে তাকে শাস্তিস্বরূপ রাজশাহীতে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। তবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সংসদ সদস্য ও তার চাচাতো ভাই পঙ্কজ দেবনাথের রাজনৈতিক প্রভাবে তিনি সেই বদলি আদেশ বাতিল করতে সক্ষম হন।


এমনকি বিগত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন বিআরটিএ চেয়ারম্যান গৌতম পালের সাথে মিলে আন্দোলন দমনে সুব্রত দেবনাথ সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে ঢাকা থেকে সরিয়ে ময়মনসিংহে বদলি করে। তবে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, সুব্রত দেবনাথ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর বাংলাদেশী এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। গুঞ্জন রয়েছে, ভারতীয় হাই-কমিশনের বিশেষ তদবিরের জোরেই তিনি ময়মনসিংহ থেকে মাত্র কয়েকদিনের মাথায় পুনরায় ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পদ তথা ঢাকা মেট্রো-৩ (উত্তরা দিয়াবাড়ী)-এর উপ-পরিচালক হিসেবে চেয়ার ভাগিয়ে নেন। বর্তমানে তিনি নিয়মিত স্বামীবাগের ইসকন কার্যালয়ে যাতায়াত করেন বলেও জানা গেছে।


ভারতে বিপুল সম্পত্তি ও ঢাকায় ফ্ল্যাট-প্লট

দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ দেশে না রেখে অবৈধ উপায়ে ভারতে পাচার করেছেন সুব্রত দেবনাথ। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে:

ভারতে সম্পদ: ভারতের বিভিন্ন স্থানে সুব্রত দেবনাথের নামে ও বেনামে একাধিক আলিশান বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

ঢাকায় সম্পদ: রাজধানীর অভিজাত এলাকা পশ্চিম রামপুরায় তার একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লটের সন্ধান পাওয়া গেছে।


বর্তমানে উত্তরা দিয়াবাড়ী কার্যালয়ে যোগদানের পর সুব্রত দেবনাথের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সাধারণ গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং অতিরিক্ত অর্থ (ঘুষ) না দিলে কোনো ফাইল ছাড় করা হচ্ছে না। এছাড়া, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের স্পষ্ট প্রজ্ঞাপন ও নির্দেশনা অমান্য করে সরকারি নথিতে পূর্ববর্তী (বিগত সরকারের আমলের) নাম ও নিয়ম ব্যবহারের প্রমাণও মিলেছে তার বিরুদ্ধে।


ভুক্তভোগীদের দাবি:

একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন লাগামহীন দুর্নীতি, রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ড এবং অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। সাধারণ গ্রাহক ও ভুক্তভোগীরা এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার দ্রুত অপসারণসহ দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।


উল্লেখিত অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্যে ঢাকা মেট্রো-৩ (উত্তরা দিয়াবাড়ী) কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সুব্রত দেবনাথের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ খুদে বার্তা পাঠিয়েও উত্তর মেলেনি ।


সিলেট প্রেস / এস


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৬-০৬-১৪ ১৭:৩৭:১৫