সিন্ডিকেট বাঁচাতে মরিয়া সিসিকের ৩ কর্তা: সাংবাদিকদের তথ্য দেওয়ার ‘অপরাধে’ কর্মচারীদের হেনস্থার ছক!

  • প্রকাশের সময় : ১৮/০৬/২০২৬ ১১:৪২:৩৫ PM

Share
32

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) রাজস্ব ও হোল্ডিং ট্যাক্স শাখায় বছরের পর বছর ধরে চলা কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি, হরিলুট ও গ্রাহক জিম্মির ঘটনা ধামাচাপা দিতে এক অভিনব ফন্দি এঁটেছেন কর আদায় শাখার শীর্ষ কর্তারা। সম্প্রতি গণমাধ্যমে এই সিন্ডিকেটের দুর্নীতি নিয়ে দফায় দফায় সংবাদ প্রকাশের পর তথ্য পাচার রোধ এবং নিজেদের পিঠ বাঁচাতে মাঠপর্যায়ের ১০০ জনেরও বেশি কর আদায়কারীকে (ট্যাক্স কালেক্টর) আকস্মিকভাবে নতুন ওয়ার্ডে বদলি করার পাঁয়তারা চলছে।

অভিযোগ উঠেছে, অ্যাসেসমেন্ট শাখার প্রধান আব্দুল বাছিত এবং তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের এই বিশাল দুর্নীতির সাম্রাজ্য আড়াল করতেই কর আদায় শাখার ৩ কর্মকর্তা মিলে এই গণ-বদলির নতুন গ্রুপ বা ফন্দি তৈরি করেছেন।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিসিকের অ্যাসেসমেন্ট ও কর আদায় শাখার মূল চালিকাশক্তি পরস্পর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এই সিন্ডিকেটের অভিযুক্ত তালিকায় রয়েছেন প্রধান অ্যাসেসমেন্ট কর্মকর্তা আব্দুল বাছিত, অ্যাসেসর আকতার সিদ্দিকী বাবলু, কবির উদ্দিন চৌধুরী এবং সহকারী কর কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান। পরস্পর আত্মীয় হওয়ার সুবাদে এই কর্মকর্তারা সিসিকের হোল্ডিং ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্ট এবং কর নির্ধারণে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে সিসিকের হোল্ডিং ট্যাক্স শাখার এই দুর্নীতির কারণে জিম্মি হয়ে আছেন নগরবাসী। অ্যাসেসমেন্ট শাখা ও কর আদায় শাখার এই চার জনের সিন্ডিকেটের দুর্নীতির কথা এখন সারা নগরীর বাসিন্দাদের জানা থাকলেও, এতো অভিযোগের পরেও এদেরকে পদ থেকে সরানো হয়নি।

বিগত কয়েকদিন ধরে সংবাদমাধ্যমে সিসিকের হোল্ডিং ট্যাক্স শাখার দুর্নীতির বিষয় আবারো প্রচারিত হওয়ার কারণে বেশ চিন্তায় আছেন দুর্নীতিবাজরা। এইসকল খবর যাতে গণমাধ্যমের কাছে না পৌঁছাতে পারে, সেজন্য প্রত্যেক আদায়কারীকে তাদের ওয়ার্ড থেকে পরিবর্তন করে নতুন ওয়ার্ডে বদলি করা হচ্ছে। আদায়কারীগণ নতুন ওয়ার্ডে গিয়ে কাজ করতে গিয়ে যাতে বেশি বিভ্রান্ত থাকেন এবং অফিসারদের দুর্নীতির কারসাজি সহজে ধরতে না পারেন—এই উদ্দেশ্যেই এই তড়িঘড়ি বদলি।

চার কুতুবকে বাঁচাতে আদায়কারীদের ওয়ার্ড পাল্টানোর জন্য কর আদায় শাখায় যে নতুন গ্রুপ তৈরি হয়েছে, সেই গ্রুপের প্রধানরা হলেন ট্যাক্সেশন অফিসার জামিলুর রহমান, সহকারী কর কর্মকর্তা তারা মিয়া ও সহকারী কর কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান।সিসিকের কর আদায় শাখায় ১০০ জনের বেশি আদায়কারী চাকরি করেন, যারা নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে রাজস্ব আদায় করেন। দীর্ঘদিন একই ওয়ার্ডে কাজ করার ফলে তাদের সাথে নগরীর মানুষের ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সেই সুবাদে করদাতারা অনেক সময় আদায়কারীদের কাছে বলে দেন যে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কীভাবে গ্রাহকদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

এছাড়া হোল্ডিং ট্যাক্সের বিল হাতে নিলেই আদায়কারীরা বুঝতে পারেন এটাতে কীভাবে কত টাকা কমানো হয়েছে বা কীভাবে কারসাজি হয়েছে।

এই বদলি প্রসঙ্গে কর আদায় শাখার চারজন আদায়কারীর সাথে কথা বললে তারা বিস্ফোরক বক্তব্য দেন। ১ম আদায়কারী বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে আমি এক ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করছি। আমার ওয়ার্ডের অলিগলি সব চেনা। এই ওয়ার্ডের অলিগলি চিনতে, বাসাবাড়ির মালিকদের চিনতে আমার বছরের পর বছর লেগেছে। এখন আমাদের ওয়ার্ড পরিবর্তন করা হচ্ছে। নতুন ওয়ার্ড চিনতে আমার অনেক কষ্ট হবে। ১/২ বছরে সকল বাসাবাড়ি চেনা যায় না, বছরের পর বছর কাজ করতে হয়। জানি না কী করবো, বুঝতেছি না।"

২য় ও ৩য় আদায়কারী যৌথভাবে বলেন, "প্রতি বছর জুনিয়রদের ওয়ার্ড পরিবর্তন করা হয় যখন খুশি তখন। আমরা সিনিয়ররা এতে খুব বেশি বিভ্রান্ত হই। কারণ জুনিয়রদের ওয়ার্ডের বাসাবাড়ি চেনাতে অনেক কষ্ট হয়। জুনিয়ররা যখন বাসাবাড়ি চিনে ফেলে, তখন আমাদের বিল বিতরণ করতে, নোটিশ বিতরণ করতে অনেক সহজ হয় এবং দ্রুত কাজ করা যায়।"

৪র্থ আদায়কারী সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এসব সব মাহবুবুরের ফন্দি। মাহবুব ভালো করে জেনে গেছে যে সে এই চেয়ারে আর থাকবে না। তাদের সিন্ডিকেটের বিষয় সব গণমাধ্যমে প্রচার হয়ে গেছে। সে ভালো করেই জানে তাদের বিভিন্ন চুরির বিষয় অফিসের লোকদের মাধ্যমেই সাংবাদিকদের হাতে যায়। যাওয়ার আগে সবাইকে যাতে শিক্ষা দেওয়া যায়, সে কারণে জামিল মিয়া আর তারা মিয়াকে নিয়ে মিলেমিশে সবাইকে হেনস্থা করছে।

"সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো যৌক্তিক কারণ বা প্রশাসনিক নীতিমালা ছাড়া মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞ কর্মচারীদের এভাবে গণ-বদলি করা হলে সিসিকের হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের স্বাভাবিক গতি পুরোপুরি থমকে যাবে। বিদায়ের আগে পুরো বিভাগকে হেনস্থা করা এবং নিজেদের অপরাধ আড়াল করার এই হীন মানসিকতার বিরুদ্ধে সিসিকের নবনিযুক্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) এবং প্রশাসকের কঠোর ও দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী কর্মচারী ও সাধারণ নগরবাসী।


সিলেট প্রেস / এফ


কমেন্ট বক্স
নিজস্ব প্রতিবেদক:

নিজস্ব প্রতিবেদক:

প্রকাশ: ২০২৬-০৬-১৮ ২৩:৪২:৩৫