সিলেটের কানাইঘাটের লোভাছড়া পাথর কোয়ারিকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া শ্রমিক নির্যাতন ও পাথর লুটপাটের দুটি আলোচিত মামলা তদন্তে অনিয়ম, প্রকৃত আসামিদের রক্ষা এবং নিরীহ শ্রমিকদের হয়রানির অভিযোগ তুলে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে লোভাছড়া লোড-আনলোড শ্রমিক ইউনিয়ন (রেজি. নং সিলেট-৮০, সিবিএ)।
বুধবার (১৫ জুলাই) সিলেট প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি মো. আখতার হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
লিখিত বক্তব্যে তারা বলেন, গত ৬ আগস্ট ২০২৫ সিলেট প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লোভাছড়া পাথর কোয়ারিতে পাথর অপসারণে অনিয়ম, শ্রমিক নির্যাতন, ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও পাথর লুটপাটসহ বিভিন্ন বিষয়ে ৮ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। পরে ১৪ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে ৮ নম্বর দাবি প্রত্যাহার করে ৭ দফা দাবিতে অটল থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তারা বলেন, ওই দাবির ৪ ও ৭ নম্বর দাবি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় কর্মস্থলে তিন শ্রমিককে নির্যাতনের ঘটনায় কানাইঘাট জি.আর. নং ১৩৪/২৫ এবং পাথর লুটপাটের ঘটনায় জি.আর. নং ১৩৫/২৫ মামলা রেকর্ড হয়। এতে তাদের দুটি দাবি বাস্তবায়নের পথে অগ্রগতি হলেও বাকি দাবিগুলো কোয়ারি চালু হলে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের আশা প্রকাশ করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, মামলা রেকর্ড হওয়ার পর থেকে পুলিশ কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করেনি। বরং অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে চলাফেরা করার সুযোগ পেয়েছে। এর ফলে মামলার বাদী নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ভুক্তভোগী সুলতান ও শহীদ এবং শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ ছাড়াই মামলাটি আপস হয়েছে উল্লেখ করে ২৭ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে আদালতে একটি মিথ্যা আপসনামা দাখিল করা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।
তারা আরও বলেন, মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে পিয়াস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী কামরুল হাসান তুহিনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং মামলার ৩০৭ ও ১১৪ ধারা প্রত্যাহার করে ৫০৬ ধারা সংযোজন করা হয়েছে, যা ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। তদন্ত কার্যক্রম গোপনে পরিচালিত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে আদালতে আপত্তি জানানোর সুযোগ থেকেও বাদী ও শ্রমিক ইউনিয়ন বঞ্চিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
শ্রমিক নেতারা আরও বলেন, আদালত ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে মামলার প্রধান আসামি তমিজ উদ্দীন পলাতক থাকায় তার স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন। তারা প্রশ্ন রেখে বলেন, কিশোর শ্রমিক আহাদ হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তারে সাফল্য দেখানো কানাইঘাট থানা পুলিশ তমিজ উদ্দীনকে গ্রেপ্তার করবে, নাকি আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তার সম্পত্তি ক্রোক করে আদালতে সমর্পণ করবে—এ বিষয়ে তারা প্রশাসনের স্পষ্ট অবস্থান জানতে চান।
অপরদিকে জি.আর. নং ১৩৫/২৫ (পাথর লুটপাট) মামলার তদন্ত নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করে শ্রমিক ইউনিয়ন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘ নয় মাস তদন্তের পরও প্রকৃত দায়ীদের বাদ দিয়ে নিরীহ দুই শ্রমিক আলমাছ উদ্দিন ও আলাউদ্দিনসহ কয়েকজন সাধারণ ব্যবসায়ীকে আসামি করা হয়েছে। তারা এ তদন্ত প্রতিবেদন বাতিল করে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সরকার অনুমোদিত সময়ের বাইরে ২৩ জুলাই থেকে ১৯ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত লোভাছড়া পাথর কোয়ারি থেকে অবৈধভাবে প্রায় ১৫ লাখ ৬১ হাজার ঘনফুট পাথর অপসারণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত প্রকৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেন, পাথর লুটপাটের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় পিয়াস এন্টারপ্রাইজ তাদের সংগঠনের সভাপতি মো. আখতার হোসেনের বিরুদ্ধে সিলেট আদালতে এবং সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে জালালাবাদ থানায় পৃথক মামলা দায়ের করেছে।পিয়াস এন্টারপ্রাইজ ৩১/৭/২৫ তারিখ শাহপরান সি আর ৩৮১/২৫ এবং ৪/৮/২৫ জালালাবাদ জিআর ৯৭/২৫ দুইটি মামলায় স্বীকার করছেন যে লোভাছড়া পাথর কোয়ারী থেকে পাথর নিচ্ছেন কিন্তু ১৩৫/২৫ মামলার তদন্তে পিয়াস এন্টারপ্রাইজ কে আসামি করা হয় নাই। তারা এসব মামলাকে হয়রানিমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত, শ্রমের পরিমাপে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম বন্ধ করে বকেয়া শ্রমমূল্য পরিশোধ, আধুনিক যন্ত্রপাতির কারণে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়া বন্ধ, দ্রুত লোভাছড়া পাথর কোয়ারি চালু, প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা এবং শ্রমিক ইউনিয়নের ৭ দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
এছাড়া কর্মস্থলে নিহত কিশোর শ্রমিক আহাদ হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধ, শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং কানাইঘাটে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা।
মুফিজুর রহমান নাহিদ



















