দায় এড়াতে পারছেনা পুলিশ

সিলেটের ফুটপাতে মেয়রসহ নেতাদের নামে লাখ টাকা চাঁদাবাজী

  • প্রকাশের সময় : ০৮/০৪/২০২৩ ০৫:৩৩:৪৬ AM

Share
66

সিলেট নগরীর ফুটপাতে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সহ বিভিন্ন রাজনৈতীক নেতাদের নামে চলছে ব্যাপরোয়া চাঁদাবাজী। এনিয়ে প্রতিনিয়ত ঘটছে নানা রকম অপ্রতিকর ঘটনা। চাঁদাবাজারদের গড ফাদার হিসাবে রয়েছে এক সময়ের ফুটপাতের হকার নুরুল ইসলাম ও আব্দুল আহাদ। দ্জুই জাতীয়তাবাদী দলের রাজনিতীর সাথে জড়িত। তাদের প্রভাবের কাছে খোদ সরকারদলীয় হকার্সনেতারাও অসহায়। অনেক সময় পুলিশের উপরও ক্ষিপ্ত হয়ে নিজেদের ক্ষমতার জানান দিতে দেখা যায় রাজপথে। যদিও এ থেকে কোন ভাবেই দায় এড়াতে পারছেনা বন্দরবাজার ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা। নানা বিতর্ক যেনো থামছেনা বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িকে নিয়ে। রায়হান হত্যাকান্ডের পর থেকে মিডিয়া পাড়ার বেশ নজর সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি)-এর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির দিকে।

সম্প্রতি স্থানীয় একটি দৈনিকে বন্দর ফাঁড়ির আওতাধীন অস্থায়ী ৬শ’ দোকানীর (হকার) কাছ থেকে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা ‘চাঁদা’ আদায় হচ্ছে মর্মে একটি অনুসন্ধানি সংবাদ প্রকাশ হয়। প্রকৃত পক্ষে নগরীতে হকারের সংখ্যা সহ¯্রাধীকের উপরে। আর এসব হর্কার নিয়ন্ত্রণ করেন নুরুল ইসলাম ও আব্দুল আহাদ। সিলেট নগরীর সবচেয়ে বেশি ফুটপাত ব্যবসায়ী বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, রাজা ম্যানশন, লালদিঘীরপার, কোর্ট পয়েন্ট, জেলা পরিষদ প্রাঙ্গণ, হাসান মার্কেটের দুপাশে ক্বিনব্রিজের নিচ, তালতলা ভিআইপি রোড হয়ে তালতলা পয়েন্ট এলাকায়। ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা কোন রকমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করেই। কিন্তু সকাল ১১টা থেকে বিভিন্ন নামে লাইনম্যান নামের দালালরা মাঠে নামেন এসব ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা উত্তোলন করতে। সিটি কর্পোরেশনের কর্মচারী থেকে শুরু করে সুইপারকেও চাঁদা দিতে হয় এসব ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। রাস্তা বন্ধ করে ব্যবসা করার কারণে, মাঝে মধ্যে পুলিশ এসে দৌড়ানি দিয়ে যানচলাচলের রাস্তা পরিষ্কার করতেও দেখা যায়।

এ নিয়ে নুরুল ইসলামগংদের সাথে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির মধ্যে দ্বন্ধ চলে আসছে বেশ কয়েক দিন থেকে। এক সময় অভিযোগ ছিলো ছোট ছোট এসব অস্থায়ী ব্যবসায়ীরা বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িকে চাঁদা দিয়ে ব্যবসা করতেন। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই সময় এখন আর নেই। বিষয়টি ঠেকেছে দলীয় পর্যায়ে। পুলিশ এখন টুটু জগন্নাথের ভুমিকা পালন করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। লাইনম্যান থেকে শুরু করে চাঁদাবাজরা যখন রাজনৈতীক নেতা আর খোঁদ মেয়রের ছত্রছায়ার লোক। সিলেট নগরীর ফুটপাতে এখন চাঁদা উত্তোলন হয় কয়েকটি গ্রুপে। তবে প্রভাব খাটিয়ে চাঁদা আদায় করে সিসিকের নামধারী লাইনম্যানরা। নতুবা তারা নিজেরাই রাস্তা পরিস্কারে নামে লাটি হাতে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের তাড়াতে দেখা যায়।

সরকারদলীয় নেতাদের চাঁদা, সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের চাঁদা, ট্রাফিক পুলিশের চাঁদা, সুইপারের চাঁদা, মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নামে চাঁদা উত্তোলনের জন্য রয়েছে এরিয়া ভিত্তিক ভাগ করা লোকজন। বন্দরবাজার থেকে জিন্দাবাজার পর্যন্ত মেয়র আরিফুল হকের নাম ভাঙ্গিয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) কয়েকজন কর্মকর্তা কর্মচারী এলাকা ভাগ ভাটোরা করে নিয়েছেন চাঁদাবাজির এলাকা হিসাবে। বন্দরবাজারে কিংবা নগরীর যেকোনো ফুটপাতে নিজেদের ইচ্ছেমতো কোনো হকার বসতে পারেন না।

এজন্য সিটি কর্পোরেশন, দলীয় নেতাদের লোকজনকে ‘ম্যানেজ’ করতে হয়। এই অনুমতির একমাত্র মাধ্যম হলো ‘লাইনম্যান’। ফুটপাতের দোকানীদের নিয়ন্ত্রণ করা, চাঁদা তোলা থেকে শুরু করে সব ধরনের যোগাযোগের জন্য লাইনম্যান হলেন মাঠ পর্যায়ের লোক। সাধারণত প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চাঁদা তোলা হয়।

শহরকে ফুটপাত মুক্ত রাখতে ২০২০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে হকার্স মার্কেটের ভেতরে একটি বাজারের ব্যবস্থা করে দেয়া হয়। সেখানে তালিকা করে হকারদের বসার ব্যবস্থা করে দেয় সিসিক। শুরুতে কিছুদিন হকাররা ওই মার্কেটে বসলেও এখন সেখানে তাদের সংখ্যা নগন্য। ‘অস্থায়ী মার্কেটে’ বসানো সিসিকের করা এই তালিকা নিয়েও হকারদের একটি বড় অংশের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেই ক্ষোভের মধ্যে উস্কানি দেন সরকারি ও বিরোধী দলের নামধারী স্থানীয় কিছু চাঁদাবাজ। এনিয়ে হকাররা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। এক পক্ষ বেশি সুবিধার আশায় মেয়র আরিফের পক্ষ নেয়, আরেক পক্ষ বিরোধিতা শুরু করে। এই পক্ষের সঙ্গে যোগ দেন লাইনম্যান ও চাঁদার টাকার সুবিধাভোগীরা। একসময় ফুটপাতের লাইনম্যান হিসাবে বলা হতো বর্তমান হকার্সলীগ নেতা রকিব আলী ও ডালিমকে। কিন্তু মেয়র আরিফুল হক ক্ষমতা গ্রহণের পর রকিবের হাত থেকে চলে যায় সব ক্ষমতা। এখন সিসিকের নামেই শতকরা ৭০% চাঁদা উত্তোলন করে সিসিকের কর্মচারিরা, এমন অভিযোগ খোদ ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের। অভিযোগ আছে, মেয়র আরিফুল হকের কাছ থেকে হকার্সদল নেতা নুরুল ও আহাদ সময় নেয় বিকাল ৫টার পর যেনো হর্কাররা ফুটপাতে ব্যবসা করতে পারেন। সেই সময় আরিফুল হক হর্কারদের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে সাময়িক অনুমতি দিলে শুরু হয় নুরুল ও আহাদের চাঁদাবাজি। তারা হর্কারদের বলতে থাকে প্রতিদিন মেয়রকে একটা টাকার অংশ দেওয়ার বিনিময়ে তারা হর্কারদের ৫টার পর থেকে ফুটপাতে ব্যবসার অনুমতি নিয়ে এসেছেন। ফুটপাতে চাঁদা উত্তোলনকারীদের নামের শীর্ষে রয়েছে জাতীয়তাবাদী হর্কাস দলের সভাপতি নুরুল ইসলাম, ২য় তালিকায় রয়েছে একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আহাদ। এই দুই রতের হাতেই সিলেট নগরীর ১ হাজার হর্কার এখন জিম্মি। তাদের মাধ্যেমেই ফুটপাটে চাঁদা উত্তোলনের এরিয়া ভাগ বাটোরা হয়ে থাকে। হকার্সদের কাছে দুজনের পরিচয়, তারা মেয়র আরিফের ডান হাত হিসাবে।

এদের মাধ্যেমেই চাঁদা উত্তোলনের দায়িত্ব পালন করছে প্রায় দশজন লাইনম্যান। বন্দরবাজার যাত্রী ছাউনীর আশপাশে চাঁদা তোলে মোমিন, এই মুমিন নিজেই স্বঘোষিত নেতা। জিন্দাবাজার একাংশে ‘লেংড়া’ কামাল, দুর্গাকুমার স্কুলের সামনে ছাব্বির, পোস্ট অফিস এলাকায় দাঁড়িওয়ালা একরাম, সিটি কর্পোরেশনের সামনে গেদু, হাসান মার্কেটের সামনে উজ্জ্বল, জিন্দাবাজার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সামনে ফারুক, ক্বিনব্রিজের নিচে রাসেল এবং চৌহাট্টা আল হামরা এলাকায় মিজান। তার মধ্যে জেলা পরিষদের সামনে শামিম নামের আরেকজন একজন কতিপয় নেতাদের নামে তুলেন ২০ টাকা করে, দিন শেষে সকলের চাঁদা তোলার হিসাব চলে যায় নুরুল ইসলাম ও আহাদের কাছে। এখান থেকে হয় চাঁদার টাকার ভাগ ভাটোয়ারা। হকার্সরা নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানান, নুরুল ও আহাদ প্রায়ই বলে থাকেন, এসব টাকা থেকে নাকি মেয়র আরিফের বাসায় দেশী মাছ আর মোরগ কিনে পাঠাতে হয় প্রতিদিন। আবার সিটি বড়-বড় স্যারকেও ভাগন দিতে হয়। ফুটপাতের ব্যবসায়ী ছাড়া প্রতিদিন আরো কয়েকটি উৎস থেকে চাঁদা উত্তোলন করে সিটির লাইনম্যানরা। তার মধ্যে কোর্টপয়েন্ট এলাকায় রাতের পাহারাদারের বেতন বাবদ প্রতিদিন ৩০ টাকা করে অন্তত শতাধিক দোকান থেকে চাঁদা তোলছে সিটি কর্পোরেশনের কর্মচারীরা। অন্যদিকে রাতের বেলা সিটি কর্পোরেশনের মূল ফটকের সামনে ‘সাজু’ নামে একজন সুপারভাইজার ৫০০ টাকা করে তুলছেন। এই ৫শ’ টাকা লাইনম্যান একরাম ও উজ্জ্বলের কাছ থেকে প্রতিদিন সংগ্রহ করে থাকে সাজু। এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বন্দরবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ সাজিদুল করিম জানান, ‘তিনি বা তাঁর কোনো কর্মী চাঁদার টাকা নেন না। তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন। আমাদের নামে কে বা কারা চাঁদা তুলে তা আমরা বলতে পারবোনা।

চাঁদাবাজির সাথের বন্দর ফাঁড়ির কোন পুলিশ সদস্যরা কোন ভাবে জড়ি নন। পুলিশের নাম ধরে সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক গ্রুপের দালালরা টাকা তুললে এর দায় পুলিশের নয়। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করি ফুটপাত যনমানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখতে। প্রায় দিনই আমরা বিভিন্ন স্থানে ফুটপাতে অভিযান চালিয়ে এসব হর্কারদের আটক করে মামলা দিয়ে আদালতের প্রেরণ করছি। এখানে চাঁদাবাজীর প্রশ্নই আসেনা।

মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ ইলিয়াস শরিফ জানান, ‘এসবের সাথে পুলিশ যাতে জড়িত না হয়-এজন্য কঠোর নির্দেশনা দেয়া আছে। এরপরও যদি কোন পুলিশ সদস্য জড়িত হয়, তার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উত্তর জোনের ডিসি আজবাহার আলী শেখ জানান, ফুটপাতে চাঁদাবাজিতো দুরের কথা বিনা কারণে কাউকে হয়রানি করলে আমরা কোন পুলিশ সদস্যকে ছাড় দিচ্ছিনা। ফুটপাতে চাঁদাবাজী বন্ধ করতে পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছেআটককৃতদের আদালতে চালান দেওয়া হচ্ছে।

যদিও এ বিষয়ে সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন,‘চাঁদাবাজির সাথে সিটি কর্পোরেশনের কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন পুলিশ কমিশনার। তবে আমার নাম ভাঙ্গিয়ে কেউ চাঁদা উত্তোলন করলে তাকেও ছাড় দেওয়া হবেনা। বিষয়টি নিয়ে আমি কয়েকদিন থেকে খোঁজ নিচ্ছি, সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকেও তদন্ত চলছে


সিলেট প্রেস / ০৮/০৪/২০২৩ এফ কে


কমেন্ট বক্স

প্রকাশ: ২০২৩-০৪-০৮ ০৫:৩৩:৪৬