তানিশার বয়স মাত্র ১৩! পড়ে রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে। এখনই চোখে ভালো করে দেখতে পায় না তানিশা। ফলে বাধ্য হয়েই ব্যবহার করতে হচ্ছে চশমা। অথচ দুই বছর আগেও তার চোখ পুরোপুরি ভালো ছিল। দেড় বছর ধরে চিকিৎসকের পরামর্শে চশমা পরতে হচ্ছে। একই সমস্যা ১১ বছর বয়সি জুবায়ের আব্দুল্লাহরও। জন্মগত কোনো সমস্যা না হলেও অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের ফলে কমেছে দূরের দৃষ্টিশক্তি।
চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক অভিভাবক শিশুদের মোবাইল থেকে শুরু করে কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও নোটবুক কিনে দিচ্ছেন। ফলে খেলাধুলা ও শারীরিক কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে শিশুরা। বেড়েছে মোবাইল আসক্তি। আর এতে করেই শিশুদের ‘মাইয়োপিয়া’ বা চোখের ক্ষীণ দৃষ্টিজনিত রোগ বাড়ছে প্রকট আকারে। তবে কী পরিমাণ বেড়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগের পরিসংখ্যানের দেওয়া তথ্য খুবই উদ্বেগজনক।
প্রতিষ্ঠানটির দেয়া তথ্য বলছে, গত দুই বছরে এ হাসপাতালে সেবা নেওয়া মাইয়োপিয়ার ভুক্তভোগী রোগীর সংখ্যা ৩২ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে হাসপাতালটিতে সেবা নিতে আসা ৪৩ শতাংশ রোগী ক্ষীণ দৃষ্টিজনিত রোগের শিকার। কম হলেও শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। যার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে খুব খারাপভাবে পড়বে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
ঢাকার চক্ষু বিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতে, প্রতিদিন ৩ হাজার রোগী এখান থেকে চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে গড়ে ৫০ শতাংশ রোগী শিশু যাদের দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক কোটি ৪৩ লাখ লোক দৃষ্টি ত্রুটির সমস্যায় ভোগেন। দৃষ্টি ত্রুটি রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
ছোটবেলা থেকে স্মার্টফোন, ট্যাবে ভিডিও গেমসের আসক্তি শিশুদের চোখের বিভিন্ন ধরনের সমস্যাসহ নানা ধরনের মানসিক সমস্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এসবের জন্য খেলার মাঠ বন্ধ হয়ে যাওয়া, লেখাপড়ার বাড়তি চাপ, সূর্যের আলোয় শিশুর না আসা, দিগন্তে সবুজের দিকে তাকিয়ে না থাকাকেই দায়ী করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী বলেন, শিশুদের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় তারা দৃষ্টি শক্তি হারাচ্ছে। অল্প বয়সেই নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। একটি শিশুর আট বছর পর্যন্ত চোখের গঠনগত পরিবর্তন হতে থাকে। এ বয়সেই যদি দূরের জিনিস না দেখে তাহলে আস্তে আস্তে দূরের দৃষ্টিশক্তিই হারিয়ে ফেলবে। বড় হলেও এটি থেকে যাবে।
ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী বলেন, শিশুদের অধিকাংশ সময়ই এখন কাটে অনলাইনে। অভিভাবকরাও তেমনভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে না। যার ফল খুবই খারাপ হবে। শিশুদের রক্ষা করতে হলে শুধু চিকিৎসকরা নয়, অভিভাবক ও শিক্ষকদেরও সমানভাবে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কথায় গুরুত্ব দেয়, তাই তাদের বিষয়টির ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।
সম্প্রতি ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের একদল গবেষক জানিয়েছেন, ঢাকার প্রতি একশ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪০ শিক্ষার্থীর চোখে ত্রুটি আছে। হাসপাতালের শিশু চক্ষুরোগ ও স্কুইন্ট বিভাগের প্রধান মো. মোস্তফার নেতৃত্বে দলটি ঢাকার ১৯টি স্কুলের ৬ হাজার ৪০১ শিক্ষার্থীর চোখ পরীক্ষা করে। এর মধ্যে আড়াই হাজারের বেশি শিশুর চোখে ত্রুটি খুঁজে পেয়েছেন তারা। তাদের চশমা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। এসব শিশু নার্সারি থেকে দশম শ্রেণিতে পড়ে। তবে ঢাকার বাইরে এই হার কিছুটা কম।
তারা আরও বলছেন, শিশুদের যে সময় দূরের দৃষ্টি তৈরি হওয়ার কথা, সে সময়ই তারা মোবাইল ফোনের কিংবা ট্যাবের স্ক্রিনে দৃষ্টিকে আটকে রাখছে। যে কারণে দূরের দৃষ্টি প্রসারিত হতে পারছে না। বংশগত কারণেও এই ক্ষীণ দৃষ্টি হতে পারে, তবে স্ক্রিন অ্যাক্টিভিটি, রোদে খেলাধুলা না করা শিশুদের মায়োপিয়ার অন্যতম কারণ।
প্রতিষ্ঠানটির কনসালটেন্ট ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল আই কেয়ার কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শহিদুল ইসলাম বলেন, দেশে অন্ধত্বের হার কমেছে। ৩৫ শতাংশ কমেছে গত ২০ বছরে। কিন্তু চশমা ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় এমন দৃষ্টি ত্রুটি বাড়ছে। তার কারণ হচ্ছে, আমাদের ঘরোয়া কাজ বেশি হচ্ছে, বাইরে বের হওয়া কম হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের বাড়ছে। কারণ, শিশুদের মধ্যে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের পরিমাণ বেশি। তাই চশমা ব্যবহারকারী রোগীর সংখ্যা শুধু বাংলাদেশেই না, সারা বিশ্বে বাড়ছে।
একই প্রতিষ্ঠানের শিশু চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আশিকুর রহমান আকন্দ বলেন, আমাদের এখানে প্রতিদিন তিন শতাধিক রোগী শিশু ইউনিটে আসে। সারা দেশ থেকেই সব ধরনের চোখের রোগ নিয়ে এখানে আসে। পাওয়ারের সমস্যা বড়দের যেমন হয়, শিশুদেরও হয়। দেখা যায় যে, চারটি শিশুর স্ক্রিনিং করলে দুটি শিশুর পাওয়ারের সমস্যা।
বাইরের দেশগুলোতে আরও বেশি। এখন দুটি কারণে বেশি রোগী আসছে। একটি হচ্ছে বেশি রোগী স্ক্রিনিং হচ্ছে। আরেকটি ইলেকট্রনিক গ্যাজেট বেশি ব্যবহারের ফলে। মোবাইলের আসক্তি একটি বড় ফ্যাক্টর, শহরের শিশুদের এ সমস্যা বেশি। সবাই ঘরের ভেতরে থাকায় যাদের সমস্যা নেই তাদেরও পাওয়ারের সমস্যা তৈরি হয়। এত বেশি মোবাইল ব্যবহারের ফলে চোখের সমস্যা এখন বেশি হচ্ছে। করোনায় অনলাইনে ক্লাস বেশি হওয়ার কারণে এ সমস্যা আমরা বেশি পাচ্ছি এখন।
চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. কৌশিক চৌধুরী বলছেন, ডিভাইস ব্যবহারের সময়ে শিশুরা লেন্স ব্যবহার করছে না। চোখের একেবারে কাছে থেকে ব্যবহার করছে। এতে করে তার দূরের জিনিস দেখার জন্য যে দৃষ্টি দরকার সেটি মাইনাস হচ্ছে। অভিভাবকের সচেতনতা সবচেয়ে বেশি হতে হবে। শিশুদের কম ডিভাইস ব্যবহার করতে দিতে হবে। খেলাধুলায় আগ্রহী করে তুলতে হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকর খাবারের দিকেও মনোযোগী হতে হবে।




















