২০২১ সালে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি-বিআরটিএ সিলেট অফিসে ফাইল জমা দিয়েছিলেন সিলেট সদরের পীরেরবাজারের ট্রাকচালক আবুল কাশেম। বারবার তাঁকে তারিখ দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো কাজ হয় না। পরে তিনি জানতে পারেন, ফাইলটি গায়েব হয়ে গেছে। সম্প্রতি সংশ্লিষ্টদের প্রতি চড়াও হলে বাধ্য হয়ে নতুন ফাইল তৈরি করে গত ১৪ সেপ্টেম্বর আঙুলের চাপ নেওয়া হয় কাশেমের।
একইভাবে ২০১৭ সালে ফাইল জমা দিয়ে ২০২৩ সালে এসে ট্রাকচালক মিন্টু মিয়া জানতে পারেন, তাঁর ফাইলটি গায়েব হয়েছে। ফেঞ্চুগঞ্জের এ ট্রাকচালক ৬ বছর ধরে হয়রানির শিকার হন। গত মার্চে ফাইল জমা দেওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক কামাল আহমদ পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে সাড়ে ৩ হাজার টাকা দিয়ে পাসের তালিকায় নাম উঠান। এভাবেই হয়রানি ও ঘুষ বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত হয়েছে সিলেট বিআরটিএ। এর নেপথ্যে রয়েছেন সিলেটের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিন) রিয়াজুল ইসলাম ও মোটরযান পরিদর্শক আবদুল বারী। তাদের নির্দেশনা ও মদদে ভেতরের কর্মচারীরা বিভিন্ন খাত থেকে টাকা আদায় করেন। টাকা না দিলে নানাভাবে হয়রানি ও কাগজপত্র আটকে রাখেন তারা। গত এক সপ্তাহ সিলেট বিআরটিএ অফিসে সরেজমিনকালে চালক ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে আলাপে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, দুই বছর আগে রিয়াজুল ইসলাম ছিলেন মোটরযান পরিদর্শক। বর্তমান মোটরযান পরিদর্শক আবদুল বারী তখন ছিলেন উচ্চমান সহকারী। কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলায় একসঙ্গে চাকরি করেছেন দু’জন। সেই থেকে তাদের জুটি। রিয়াজুল ও বারী রসায়নে জিম্মি এখন সিলেটের লাখ লাখ সেবাগ্রহীতা। নিজেদের লোক দিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা আদায় করছেন তারা। ঘুষ না দিলে কোনো কাজ হয় না সিলেট বিআরটিএতে। এর মধ্যে রিয়াজুল পেয়েছেন বাড়তি সুনামগঞ্জ জেলার দায়িত্ব। এ যেন সোনায় সোহাগা। সিলেটে সিএনজিচালিত অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন বন্ধ থাকলেও সুনামগঞ্জে অব্যাহত রয়েছে। সেখানে অনুমতি পাওয়া ২ হাজার গাড়ির মধ্যে প্রায় ৭০০ গাড়ি তাঁর হাত ধরেই রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। যেখান থেকে বাড়তি ‘আয়’ করেছেন কোটি টাকার ওপর।
একাধিক চালক ও মালিক জানিয়েছেন, জেলার অটোরিকশা নগরীতে মালিকানা বদল করে সম্প্রতি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন রিয়াজুল ও বারী। যদিও ২০২২ সালের ২ অক্টোবর সিলেটে জেলা আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরসিটি) সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, জেলার গাড়ি মেট্রোতে মালিকানা পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু সহকারী পরিচালক নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই মানেননি। অটোরিকশাপ্রতি ৩০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনৈতিক সুবিধা নিয়ে জেলার অটোরিকশার মালিকানা মেট্রো এলাকায় করেছেন রিয়াজুল। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ৫৫টি মালিকানা বদলির প্রমাণ পাওয়া গেছে। গত দেড় মাসে কম হলেও কয়েক’শ গাড়ির মালিকানা বদল করা হয়েছে বলে চালকরা জানিয়েছেন।
শিবিরের সক্রিয় কর্মী রিয়াজুল
বিভিন্ন স্থানে একসঙ্গে জুটি হয়ে কাজ করেছেন রিয়াজুল ও বারী। রিয়াজুল ছাত্রাবস্থায় শিবিরের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ২০২০ সালে চাঁদপুরে মোটরযান পরিদর্শক ছিলেন তিনি। ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর চাঁদপুর থেকে কুমিল্লায় অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। তখন কুমিল্লায় আবদুল বারী ছিলেন উচ্চমান সহকারী। বিআরটিএ অফিসে প্রবাদ আছে– টাকা ছাড়া ফাইল স্থবির।
এদিকে, গত ২০ মার্চ সিলেট জেলা বাস মিনিবাস কোচ মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়ন রিয়াজুল ইসলাম ও আবদুল বারীকে প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন করে। পরে শ্রমিক নেতাদের ম্যানেজ করে নেন ওই দুই কর্মকর্তা।
ঘুষ আদায়ের রকমফের
প্রত্যেক সপ্তাহে ৪ দিন ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা হয়। প্রতি বোর্ডে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫০-২০০ জন। মাসে কমপক্ষে আড়াই থেকে ৩ হাজার জন লাইসেন্সের জন্য পরীক্ষা দেন। প্রত্যেকের কাছ থেকে সরকারি ফি ছাড়া বাড়তি আরও ৪ হাজার টাকা বেশি রাখা হয়। সেই হিসাবে আড়াই হাজার চালকের কাছ থেকে শুধু লাইসেন্স বাবদই কোটি টাকা ঘুষ আদায় হয়।
সূত্রমতে গাড়ির লাইসেন্স পেশাদার হিসেবে সরকারি ফি ৩৪৫ ও ২ হাজার ৭৭২ টাকা এবং অপেশাদার ৫১৮ ও ৪ হাজার ৪৯৭ টাকা। কিন্তু বিআরটিএ সিন্ডিকেট সরকারি ফির বাইরে আঙুলের ছাপ বাবদ ১ হাজার এবং পাস বাবদ ৩ হাজার টাকা আদায় করা হয়। গাড়ির নাম বদল, ফিটনেস এবং কোনো কারণে রং বা বডি উঁচু-নিচু হলে অতিরিক্ত আরও ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা দিতে হয়।
এই সিন্ডিকেটের সঙ্গী যারা
রিয়াজুল ইসলামের নির্দেশনায় টাকা আদায় করেন মোটরযান পরিদর্শক আবদুল বারী, সহকারী সামিউল ইসলাম, আরেক মোটরযান পরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন, কর্মচারী মোহাম্মদ আলী, মেকানিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট সাদিকুর রহমান ও অফিস সহকারী সাইফুল ইসলাম। রেজিস্ট্রেশন শাখার দায়িত্বে থাকা ইসমাঈল হোসেন ও ইমন নামে আরেক অফিস সহকারীর নাম এসেছে। প্রত্যেকেই ৫০০ থেকে কয়েক হাজার টাকা বাড়তি নেন।
মিশন নতুন রেজিস্ট্রেশন
জেলায় ২১ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। রেজিস্ট্রেশনবিহীন রয়েছে আরও ১০-১৫ হাজার। মামলা শেষ হওয়ার পর সম্প্রতি শুরু হয় নতুন রেজিস্ট্রেশনে তোড়জোড়। প্রায় ৫ হাজার অটোরিকশা নিবন্ধনের কথা রয়েছে। এই মিশন শেষ করতে নেমেছেন রিয়াজুলরা। ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে প্রস্তুত গাড়ির মালিকরাও। এর মাধ্যমে ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতে পারে বলে ধারণা বাগবাড়ী এলাকার সিএনজিচালিত অটোরিকশা মালিকদের।
কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
সম্প্রতি অবসরে যাওয়া বিআরটিএ সিলেটের উপপরিচালক মো. শহিদুল আজম লাইসেন্সপ্রাপ্তিতে ভোগান্তির বিষয়টি স্বীকার করেন। অফিসে ঘুষ গ্রহণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে হয়তো অনিয়ম হতে পারে। আমরা চেষ্টা করি, গ্রাহকরা যাতে হয়রানির শিকার না হন।
অভিযোগ বিষয়ে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, সরকারি ফির বাইরে কোনো টাকা তাঁর অফিসে কেউ নেন না। অটোরিকশা মালিকানা বদল বিষয়ে তিনি জানান, আরসিটির সভার সিদ্ধান্ত মেনে মালিকানা বদল করা হয়নি।
মোটরযান পরিদর্শক আবদুল বারী তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে বিস্তারিত কথা বলতে চাইলেও তিনি রাজি হননি।




















