মুল্লুক চল’ দিবসের ১০২ বছর এখনও মিলেনি রাষ্ট্র্রিয় স্বীকৃতি

  • প্রকাশের সময় : ২০/০৫/২০২৩ ০৩:৫১:৩২ AM

Share
139

 দেশে পালন করা হয়ে থাকে অনেক দিবস। সেইসব দিবসের ঘিরে ‘মুল্লুক চল’ দিবসটির বিষয়বস্তু অনেকের কাছেই অজানা। যদিও ‘মুল্লুক চল’ দিবসের তাৎপর্য কোন অংশেই কম নয়। এরকম একটি দিবস হল চা-শ্রমিক দিবস বা ‘মুল্লুক চল’ দিবস। আর এই ১০২তম দিবসকে ঘিরে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে হবিগঞ্জ জেলার চা-বাগানগুলোতে। এর মধ্যে রয়েছে র‌্যালী, আলোচনা সভা ও পুষ্পস্তবক অর্পণ।


জানা যায়, ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালিনী ছড়ায় যখন প্রথম চায়ের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় তারপর থেকেই আসাম অঞ্চলে (সিলেট তখন আসামের অংশ) চা-শিল্পের ব্যাপক বিস্তার লাভ করতে থাকে। চা-শিল্প মূলত একটি শ্রমঘন শিল্প। চা-শিল্পের বিস্তারের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় শ্রমিক সংকট। ১৮৫৩ সালে আসামে প্রতি বর্গমাইলে লোকসংখ্যা ছিল ৩০ জন, সিলেটে ছিল ২০০ জন। তাছাড়া আসামের মাটি ছিল সোনা ফলা। ফলে এই অঞ্চলের কৃষকরা চা বাগানে কাজ করাকে অসম্মানজনক মনে করত। এর জন্যে ব্রিটিশরা চা-শ্রমিকের জন্য আসামের বাইরে হাত বাড়ায়। মূলত বিহারের ছোট নাগপুর, উড়িষ্যা, অন্ধ প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ থেকে এই সব শ্রমিকদের সংগ্রহ করা হয়। শ্রমিক সংগ্রহকারীরা এই সময় দারিদ্রপীড়িত এলাকার মানুষকে এক সমৃদ্ধ জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে জাহাজে তোলে। তারপরই শুরু হয় এক করুণ কাহিনী। যে জাহাজে ২০০ জনের ধারণ ক্ষমতা সেখানে তোলা হয় ১০০০ জনকে। পথ কাটে ক্ষুধা আর যন্ত্রণায়। জাহাজ যখন ঘাটে ভিড়ে তখন লাশ এবং জীবন্ত মানুষের সংখ্যা থাকে সমান। এরপর তাদেরকে নিয়ে আসা হয় আসামে তাদের জন্য নির্ধারিত এলাকায়। এখন যেখানে সবুজ সুন্দর চা বাগান দেখছেন সেখানে তখন ছিল বিস্তীর্ণ জঙ্গল। এই জঙ্গলে ছিল হিংস্র পশু-পাখি আর পোকামাকড়। শ্রমিকদের প্রাথমিক কাজ ছিল এই ভয়ংকর জঙ্গল পরিষ্কার করে চা বাগানের উপযোগী করা।


অপরদিকে চা বাগানের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল ইংরেজরা। আসামের এই জঙ্গলে তখন দাগী অপরাধী, বখাটে এবং উচ্ছৃঙ্খল ইংরেজদের পাঠানো হত। একদিকে ভয়ংকর জঙ্গল, হিংস্র জন্তু-জানোয়ার, অর্ধাহার, অনাহার, রোগ-শোক অন্যদিকে ইংরেজদের অমানবিক আচরণ। দ্রুতই এইসব অসহায় মানুষদের স্বপ্ন ফিকে হয়ে যেতে থাকে। মরতে থাকে তারা গণহারে। এক হিসেবে দেখা যায়, প্রথম তিন বছরে যে ৮৪ হাজার ৯১৫ জন শ্রমিক আমদানি করা হয়েছিল তার মধ্যে ৩১ হাজার ৮৭৬ জন এভাবেই মারা যায়। ইংরেজদের বিরুদ্ধে যখন সারাদেশে স্বদেশী আন্দোলন চলছিল তখন এর ঢেউ চা বাগানগুলোতেও পরে। 


চা-শ্রমিকরাও আস্তে আস্তে তাদের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হতে থাকে, অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে থাকে। তাদের নেতা পণ্ডিত দেওশরন এবং গঙ্গা দীতির নেতৃত্বে ১৯২১ সালের ২০ মে ‘মুল্লুক চল’ বা ‘দেশে চল’ কর্মসূচির ডাক দেয়। সিলেটের বিভিন্ন চা বাগান থেকে পঙ্গপালের মত বের হয়ে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক সিলেট রেলস্টেশনে এসে জড়ো হয়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তারা তখন রেল পথ ধরে হেঁটে চাঁদপুর স্টিমার ঘাটে পৌছায়। চাঁদপুর স্টিমার ঘাটে ব্রিটিশ সরকার গুর্খা রেজিমেন্টের সৈন্যদের দ্বারা নির্বিচারে গুলি চালিয়ে শতশত শ্রমিককে হত্যা করে। কত মানুষ ঐদিন নিহত হয়েছিল তার পরিসংখ্যান কখনও জানা যায়নি। তারপর থেকেই ঐ দিনকে চা-শ্রমিকরা ‘চা-শ্রমিক দিবস’ বা ‘মুল্লুক চল দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত চানপুর চা বাগানের সভাপতি সাধন সাওতাল জানান, ‘মুল্লুক চল’ দিবস উপলক্ষে প্রতিটি চা বাগানে আজ শনিবার সকাল ১০টার দিকে র‌্যালী হবে। পরে লস্করপুর ভ্যালীতে গিয়ে সকলে একত্রিত হয়ে বৃহৎ আকারে র‌্যালী ও আলোচনা সভা হবে। সেখানে আমাদের অধিকারসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।



সিলেট প্রেস / ২০ মে ২০২৩/ এফ কে


কমেন্ট বক্স
সিলেটপ্রেস ডেস্ক

সিলেটপ্রেস ডেস্ক

প্রকাশ: ২০২৩-০৫-২০ ০৩:৫১:৩২