জকিগঞ্জ সীমান্তে ​'বিচি' 'বোতাম', 'মাল' সাংকেতিক ভাষায় চলছে কোটি টাকার মাদক কারবার

  • প্রকাশের সময় : ০৬/০৭/২০২৬ ০৬:৪৫:০৯ AM

Share
3

সিলেটের সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলা এখন ইয়াবা পাচারের অন্যতম প্রধান ও সক্রিয় রুটে পরিণত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে মাদক কারবারিরা ব্যবহার করছে নিত্যনতুন চতুর কৌশল। সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত সাধারণ ও নিরীহ মনে হলেও, মাদক সিন্ডিকেটের কাছে এখন ইয়াবার পোশাকি নাম ‘বিচি’, ‘বোতাম’ কিংবা ‘মাল’। এই সব সাংকেতিক শব্দের আড়ালেই সীমান্তজুড়ে দেদারসে চলছে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা বাণিজ্য।

​স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারত সীমান্তঘেঁষা জকিগঞ্জের বিভিন্ন দুর্গম পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত ইয়াবার বড় বড় চালান দেশে প্রবেশ করছে। এরপর সড়কপথে সিলেট হয়ে তা ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার ও বাহক আটক হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আড়ালে থেকে যাচ্ছে মূল কারবারিরা।

​সম্প্রতি সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কঠোর নজরদারির কারণে চোরাকারবারিরা কিছুটা চাপে পড়লেও থেমে নেই তাদের তৎপরতা। বরং কৌশল পরিবর্তন করে পাচার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে তারা। জকিগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রী ইউনিয়নের জিরো পয়েন্ট থেকে কসকনকপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত সুরমা-কুশিয়ারা নদীঘেঁষা সীমান্ত এলাকাটি বর্তমানে ইয়াবা পাচারের অন্যতম প্রধান করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই রুটে জিরা, প্রসাধনীসহ অন্যান্য ভারতীয় পণ্যের চোরাচালান নিয়ে আলোচনা থাকায়, ইয়াবা পাচারের বিষয়টি অনেকটাই আড়ালে ছিল। আর সেই সুযোগেই এখানে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য মাদক সিন্ডিকেট।

​সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাচারকারীরা এখন অত্যন্ত অভিনব কৌশল অবলম্বন করছে। দিনের বেলায় জেলের ছদ্মবেশে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে বিশেষভাবে মোড়ানো ইয়াবার প্যাকেট সংগ্রহ করে তারা। অনেক সময় ভারতের অংশ থেকে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া প্যাকেট পূর্বনির্ধারিত চিহ্ন দেখে মাঝনদী থেকে উদ্ধার করেন বাংলাদেশি সহযোগীরা। এছাড়া রাতের অন্ধকারে কখনও সাঁতরে, আবার কখনও সীমান্তের কাঁটাতারের ফাঁক গলে ইয়াবা দেশে আনা হয়।

​পরবর্তীতে সীমান্তবর্তী নিরাপদ স্থানে তা মজুত করে স্থানীয় বাহকদের মাধ্যমে বড় কারবারিদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন গণপরিবহনে সাধারণ যাত্রীর ছদ্মবেশে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয় ইয়াবার চালান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশির ঝুঁকি তৈরি হলে তাৎক্ষণিক বাহক পরিবর্তন, পোশাক বদল কিংবা রুট পরিবর্তনের মতো চতুর কৌশলও গ্রহণ করে তারা।

অভিযানে কেবল বাহকই আটক, অধরা মূলহোতারা
​অনুসন্ধানে জানা যায়, গত জুন মাসে জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারে একাধিক বড় ধরনের অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা জব্দ হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অভিযান হলো:

১৩ জুন: বিয়ানীবাজার উপজেলার দুবাগ ইউনিয়নের পাঞ্জিপুরী এলাকায় পুলিশের চেকপোস্টে একটি যাত্রীবাহী বাস থেকে ৯ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ এবং একজনকে আটক করা হয়।

১৫ জুন: জকিগঞ্জ উপজেলার মানিকপুর ইউনিয়নের শাহজালালপুর এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে ১ হাজার পিস ইয়াবা ও একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয় (তবে দুই বাহক পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়)।

২৫ জুন: জকিগঞ্জ-শেওলা সড়কের খলাছড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৯০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ।

২৯ জুন: মানিকপুর ইউনিয়নের খাসেরা এলাকায় আরও ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

​স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অভিযানে যারা আটক বা অভিযুক্ত হচ্ছেন তারা মূলত টাকার বিনিময়ে কাজ করা সামান্য ভাড়াটে বাহক। ভারত থেকে চালান সংগ্রহ, সীমান্ত পারাপার এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়ার পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণকারী মূল সিন্ডিকেটের সদস্যরা বরাবরের মতোই রয়ে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। একটি সূত্র জানায়, প্রতিটি সফল চালানের জন্য বাহকদের নির্দিষ্ট মোটা অঙ্কের পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। কিন্তু মূল পরিচালনাকারীরা কখনোই সরাসরি মাদক বহন করেন না, ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তাদের ধরা পড়ার ঝুঁকিও কম থাকে।

​এই বিষয়ে সিলেটের জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) ড. চৌধুরী মোহাম্মদ যাবের সাদেক জানান,​"মাদকের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছি এবং সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে রয়েছি। গত মাসে জকিগঞ্জ থেকে ১০ হাজার এবং বিয়ানীবাজার থেকে ৯ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু বাহক নয়, এই মাদক কারবারের পেছনে থাকা মূলহোতাদেরও আইনের আওতায় আনতে আমাদের কাজ চলছে। তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের ওপর আমাদের কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।"


​সীমান্তবর্তী এই জনপদকে মাদকের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে টহল জোরদার করার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স

প্রকাশ: ২০২৬-০৭-০৬ ০৬:৪৫:০৯