ঈদের পরই গরম হতে শুরু করবে সিলেট সিটি নির্বাচনের মাঠ। খোলাসা হবে প্রার্থী তালিকাও। আওয়ামী লীগ ও অন্য দলগুলোর পাশাপাশি নির্বাচনে থাকতে পারেন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী। যেহেতু নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপি এখনো অনড়, তাই দলটির একজন বা একাধিক নেতা স্বতন্ত্র হিসাবে প্রার্থী হতে পরেন। এরমধ্যে বর্তমান মেয়র আরিফকে নিয়েই সবচে বেশি জল্পনা-কল্পনা। তবে বিএনপি থেকে প্রার্থী হওয়ার কথা জানিয়েছেন বদরুজ্জামান সেলিম। তিনি ঈদের পর দেশে ফিরবেন। তার পক্ষ থেকে আগাম সালাম-শুভেচ্ছা পাঠানো হচ্ছে নগরবাসীর কাছে। নির্বাচন নিয়ে বিএনপির এই কৌশল সম্পর্কে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ঘোমটা পরে বিএনপির অনেকেই প্রার্থী হবেন।
সিলেট মহানগরীতে ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। তিনি যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের নেতা। নৌকা পাওয়ার পর তিনি মাঠে তৎপর। দলটির আরেক নেতা ফয়জুল আনোয়ার আলাউর কানাডা থেকে দেশে ফিরেছেন। নির্বাচন নিয়ে তিনি ঈদের পর মুখ খুলবেন। এখন মাঠে প্রচারে আছেন জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী। তবে ডানপন্থি জামায়াত ও বামপন্থিদের কেউই মাঠে নেই। তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না।
নির্বাচন প্রসঙ্গে সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ঈদের পর সব খোলাসা করব। আর মাত্র ক’টা দিন। আর তার ঘনিষ্ঠরা বলেন, প্রার্থী হলে বা না হলেও যাতে নির্বাচন ইস্যুতে আরেকটা অর্জন ক্যারিয়ারে যোগ হয় সেই চেষ্টাতেই আছেন আরিফ। তাদের মতে, নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে বিজয়ী হলে এটা হবে মেয়র হিসাবে আরিফের হ্যাটট্রিক জয়। আর কোনো ও কারণে নির্বাচনে না গেলে সেখানেও একটা অর্জন চান আরিফ। প্রত্যাশা চেয়ারের বদলে চেয়ার। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে চলছে জোর লবিং, আলোচনা। নির্বাচন বয়কট করলে যেন দলের ভাইস চেয়ারম্যানের পদ নিশ্চিত করা যায়। ঈদ পর্যন্ত চলবে এই তৎপরতা। দলে পদোন্নতি নিশ্চিত করা না হলে নির্বাচনে প্রার্থী হবেন তিনি। এই লক্ষ্যে আড়ালে কাজ করছে ‘প্রেশার গ্রুপ’। দলের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ার মতো চাপ সৃষ্টিতে তারা গলদঘর্ম। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, দলের নির্দেশনা, চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ এবং বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
নির্বাচন সামনে রেখে মেয়র আরিফ যখন হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত, তখন হাজির মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম। বিদেশের মাটিতেও তিনি বসে নেই। মিটিং করছেন গ্রুপ কলে। প্রার্থীও হতে চান। তিনি যুগান্তরকে জানান, সিটি এখন অনেক বর্ধিত হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ওসব এলাকা অনেকবার চষে বেড়িয়েছি। সবাই পরিচিত। অনেক ফোন আসছে ঈদের ছুটিতেই দেশে ফিরব। গত নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলাম। আরিফের বিজয় নিশ্চিতের কথা বলে আমাকে জোর করে নির্বাচনি মাঠ থেকে বিদায় করা হয়েছিল। এ কারণে দেশত্যাগ করেছিলাম। তিনি বলেন, দল বা ব্যক্তি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে জনপ্রিয়তা কমে। এই সমীকরণ অনুযায়ী সরকারের যেমন আগের জনপ্রিয়তা নেই, মেয়র আরিফের জনপ্রিয়তাও অনেক কমেছে। তাই সরকারবিরোধী বলয়ের শক্তিশালী প্রার্থী এখন আর আরিফ নন। পরিবর্তন চান নগরবাসী। তাছাড়া মেয়র আরিফ দলের কেন্দ্রীয় নেতা, আমার কোনো পদ-পদবি নেই। আমি প্রার্থী হলে দলীয় কোনো সমস্যা হবে না।
তবে নির্বাচন নিয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, পাতানো ফাঁদে আমরা পা দেব না। সরকার ও নির্বাচন ইস্যু এখন জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সেখানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির লোক নির্বাচনে যাবেন বলে আমার বিশ্বাস হয় না।
আর মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসেইন বলেন, ‘এ মুহূর্তে বিএনপি এক দফার দাবিতে অনড়। এই নির্বাচনে বিএনপির ব্যানারে কেউই প্রার্থী হবেন না। আগে সঠিক নির্বাচনি পরিবেশ আসুক, তারপরে নির্বাচন।’
এদিকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত ১০ নেতা এখনো আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর প্রতি মনেপ্রাণে ইতিবাচক হয়ে উঠতে পারেননি। যদিও অভিনন্দন জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিবৃতি দিয়েছেন। জানা যায়, মনোনয়নবঞ্চিত ১০ নেতার ৮ জনই বেঁকে বসে আছেন। মনের দুঃখে বিদেশ চলে গেছেন কেউ কেউ। আনোয়ারুজ্জামন সোমবার নৌকা প্রতীক নিয়ে সিলেট ফেরার পর সংবর্ধনা, মহড়া, শোডাউন হয়। অথচ নৌকাবঞ্চিত প্রভাবশালী ৮ নেতা সেখানে যাননি। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আসাদ উদ্দিন আহমদ ও আবদুল খালিক, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এটিএমএ হাসান ওরফে জেবুল, আজাদুর রহমান আজাদ, সদস্য প্রিন্স সদরু জ্জামান চৌধুরী এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য মাহিউদ্দিন আহমদ ওরফে সেলিম। এরমধ্যে অধ্যাপক জাকির হোসেন ও আজাদুর রহমান আজাদ বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন বলে তাদের অনুসারীরা জানিয়েছেন।
এতেই শেষ নয়। আরও সমস্যা আছে শাসক দলে। কানাডায় চিকিৎসাধীন থাকা ফয়জুল আনোয়ার আলাউর ফিরেছেন দেশে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করে আসা এই নেতা বলেন, আ.লীগের কিছু ভুলের কারণেই নগরপিতা বিএনপির। আবারও আরেক ভুলের কারণে মাশুল দেওয়া যায় কী? তিনি বলেন, অনেক চাপে আছি। জোর করে ছবি তুলে নগরীতে ফেস্টুন টানিয়েছেন শুভাকাক্সক্ষীরা। নৌকা আমার প্রাণের প্রতীক, নৌকার বিজয় নিশ্চিত করা চাই। ইনডোর আলোচনা অব্যাহত আছে, ঈদের পরই আউটডোরে যাব।
জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, বিএনপি নির্বাচনে আসবে না বললেও নগরবাসী নির্বাচনের অপেক্ষায়। অথচ তাদের একাধিক নেতা প্রার্থী হতে তৎপর। যদিও তাদের নেতারা লুকিয়ে প্রার্থী হতে চান। নিজ দলের মনোনয়নবঞ্চিতদের অভিমান ও বিদ্রোহী প্রার্থীর আশঙ্কা সম্পর্কে তিনি বলেন, এটা আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দল। চেইন অব কমান্ড অনেক শক্ত। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকরা মান, অভিমান, ক্ষোভ প্রকাশ করলেও নৌকা আর আদর্শের বাইরে অন্য কিছু ভাবেন না। সময়ে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। নৌকার জয় নিশ্চিতে নগরবাসীকে নিয়ে সবাই একাট্টা।
সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ বলেন, নির্বাচনের প্রতীক যেখানে নৌকা সেখানে দলে অনৈক্যের কোনো সুযোগ নেই। আর যারা নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা গুঞ্জন, গুজব রটাচ্ছেন, সেসব ‘ভোটের রাজা’দের দলে কোনো ঐক্য নেই।
সিটি নির্বাচন নিয়ে বিএনপির কয়েক প্রবীণ নেতা বলেন, নির্বাচন বয়কট করে দখলে থাকা মেয়র পদও হাতছাড়া করা বিএনপির জন্য ঠিক হবে না। মেয়র আরিফকে ফের প্রার্থী করা ও বিজয় নিশ্চিতে মহানগরীর নির্দলীয় প্রভাবশালী মহল ও সাধারণ ভোটারদের বৃহৎ অংশ একাট্টা। তবে ততটা একাট্টা নয় স্থানীয় বিএনপি। দলের পদধারী, পদহীন অনেকেই চান না আরিফ ফের মেয়র হন। তারা দলের সিদ্ধান্ত পালনের নামে আরিফকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার মিশনে ব্যস্ত। শুধু তাই নয়, আরিফ স্বতন্ত্র-নির্দলীয় হিসাবে প্রার্থিতা ঘোষণা করলেই বিএনপি পরিবারের আরও দু-একজনকে বিদ্রোহী প্রার্থী করতে চান আরিফকে বেকায়দায় ফেলতে। গত রোববারের শোডাউনে ছাদখোলা গাড়িতে মেয়র আরিফের সঙ্গে ছিলেন বিএনপির ক্ষুদ্র ঋণ ও কুটির শিল্পবিষয়ক সহ-সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক। মেয়রের এই ঘনিষ্ঠজন বলেন, ‘ঈদের পরপরই নাটকীয় মোড় লক্ষ্য করবেন, অপেক্ষায় থাকুন।’
নির্বাচনে অংশগ্রহণ, মনোনয়ন, প্রার্থী বাছাই নিয়ে যখন এই অবস্থা তখন সুযোগ নিচ্ছে জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী মহানগর জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক শিল্পপতি নজরুল ইসলাম বাবুলের ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে নগরী। গণসংযোগ করছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে। তিনি বলেন, সিলেট জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টি আমাকে এককভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রও মূল্যায়ন করবে আমার বিশ্বাস। সিলেট আমার শহর। দীর্ঘদিন এই শহরেই রাজনীতি, সমাজসেবা ও ব্যবসা করছি। ভোটাররা আমাকে খালি হাতে ফেরাবেন না। জাপার আরও দুই নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান চৌধুরী ও যুক্তরাজ্য জাতীয় পার্টির সহসভাপতি আবদুস সামাদ নজরুল প্রার্থী হবেন বলে শোনা গেলেও তাদের তেমন তৎপরতা নেই।
নির্বাচন নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থীও তৎপর। অসহ্য এই গরমে ভোটারদের কাছে হাতপাখার শীতল বাতাসের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিদিনই যাচ্ছেন অলিগলির ভোটারদের কাছে। দলটি মেয়র পদে মনোনয়ন দিয়েছে সিলেট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসানকে। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, নির্বাচনকেন্দ্রিক গণসংযোগ অনেকটা রেওয়াজ। আমাদের গণসংযোগ ওরকম নয়। নির্বাচন ছাড়াই আমরা সাধারণ মানুষদের কাছে সারা বছরই যাই। এখন নির্বাচন সামনে তাই প্রতীক ও ভোটের কথা বলি। এই তৎপরতা নির্বাচনের আগে-পরেও থাকে, থাকবে। আমরা ইসলাম, দেশ, মানবতার কল্যাণে নিবেদিত আছি, থাকব।




















