চলবে

আড়ালে থেকে সিলেট সীমান্ত গিলছেন ‘ডিসকো’ শামসুলের জামাতা সনি!

  • প্রকাশের সময় : ২৭/০৬/২০২৬ ০৫:৩৭:৪৩ AM

Share
10

সিলেটের সীমান্ত এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ অপরাধ ও চোরাচালান সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রয়েছেন একসময়ের কুখ্যাত মাদক ডিলার শামসুল আলম ওরফে 'ডিসকো শামসুল' এবং তার জামাতা শহিদুল ইসলাম সনি। শ্বশুর ডিসকো শামসুলের প্রত্যক্ষ মদদ, অভিজ্ঞতা ও দেখানো পথ ধরে জামাতা সনি সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট ব্যবহার করে মাদক, অবৈধ ভারতীয় জিরা ও চোরাচালানের এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।


কখনো প্রকাশ্যে আসেন না সনি: নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়েন

অনুসন্ধানে জানা যায়, শহিদুল ইসলাম সনি অত্যন্ত ধূর্ত ও চতুর প্রকৃতির অপরাধী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা সাধারণ মানুষের চোখ ফাঁকি দিতে তিনি কখনোই নিজে প্রকাশ্যে আসেন না বা কোনো অপরাধের স্পটে সশরীরে উপস্থিত থাকেন না। সম্পূর্ণ আড়ালে বা পর্দার অন্তরালে থেকে তিনি পুরো সিন্ডিকেটের সুতা ঘোরান। মাঠ পর্যায়ে চোরাচালানের মালামাল খালাস, মাদকের চালান পার করা কিংবা তা বিক্রির জন্য তিনি টাকার বিনিময়ে বিশ্বস্ত লোক বা ‘লাইনম্যান’ নিয়োগ করে রেখেছেন। কোনো চালানের লোক ধরা পড়লেও মূল হোতা সনি সবসময় আড়ালে থাকার কারণে অধরাই থেকে যান।


শ্বশুরের হাত ধরে জামাতার উত্থান

অনুসন্ধানে জানা যায়, শামসুল আলম ডিসকো দীর্ঘদিন ধরে জকিগঞ্জ ও কালিগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় মাদকের শীর্ষ কিংপিন হিসেবে পরিচিত। ইতিপূর্বে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ র‍্যাবের হাতে একাধিকবার ধরাও খেয়েছেন তিনি। তবে জামাতা শহিদুল ইসলাম সনি তার মেয়েকে বিয়ে করার পর এই সিন্ডিকেটে নতুন মাত্রা যোগ হয়। শ্বশুর ডিসকো শামসুল নিজে পেছনের গাইড হিসেবে কাজ করেন এবং জামাতা সনিকে এই অন্ধকার জগতের সমস্ত রুট ও কৌশল চিনিয়ে দেন। শ্বশুরের সেই শক্ত নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়েই সনি আজ আড়ালে থেকে এই অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন।


রুটের ভিন্নতা: জকিগঞ্জে মাদক, হরিপুর ও গোয়াইনঘাটে জিরা

অনুসন্ধানে সনির চোরাচালান সিন্ডিকেটের সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক রুটের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা জকিগঞ্জের কালিগঞ্জ বর্ডার সাইট ব্যবহার করে সনির বিশ্বস্ত লোকেরা মূলত বড় বড় মাদকের চালান দেশে প্রবেশ করায়। অন্যদিকে, চোরাই পথে ভারতীয় জিরা আনার জন্য সনি ব্যবহার করেন দুটি আলাদা রুট—হরিপুর সীমান্ত এবং গোয়াইনঘাট সীমান্ত। সনির এই তিন রুট সীমান্ত এলাকা থেকে শুরু করে সিলেট মহানগরের ভেতরের অপরাধ চক্র পর্যন্ত বিস্তৃত।

জাল অকশন পেপার ও ভুঙ্গা ব্যবসা

হরিপুর ও গোয়াইনঘাট সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পথে আসা ভারতীয় জিরা চোরাচালানের ক্ষেত্রে সনি এক ভয়ংকর জালিয়াতির আশ্রয় নেন। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তিনি কাস্টমসের ভুয়া ও জাল অকশন (নিলাম) কাগজপত্র তৈরি করেন। এই জাল কাগজের আড়ালে চোরাই জিরাসহ বিভিন্ন অবৈধ মালামালকে বৈধ দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাচার করা হয়, যা চোরাকারবারিদের কাছে ‘ভুঙ্গা ব্যবসা’ নামে পরিচিত।

কালিঘাট সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ

জকিগঞ্জের কালিগঞ্জ বর্ডার দিয়ে আসা মাদকের বড় চালান এবং হরিপুর ও গোয়াইনঘাট থেকে আসা চোরাই জিরা সিলেটের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা কালিঘাটের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বণ্টন করা হয়। সনি সরাসরি কালিঘাটের এই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত থেকে পুরো ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। এখানেও তিনি নিজে সামনে না এসে তার নিয়োজিত লোক দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন।

সিলেটে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি ও বেনামি সম্পত্তি

চিটাগাং এর  বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম সনি সিলেটে এসে তার নানাবাড়ি ছড়ারপার এলাকায় একটি সাধারণ চাকরি শুরু করেছিলেন। কিন্তু শ্বশুরের হাত ধরে মাদক ও চোরাচালান জগতে প্রবেশের পর আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যান তিনি। বর্তমানে সিলেটের ছড়ারপার এলাকায় সনির একটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে। এছাড়া সিলেটের  বিভিন্ন প্রাইম লোকেশনে তার নামে-বেনামে বিশাল সম্পত্তি ও জমি রয়েছে বলে জানা গেছে। নিজের অবৈধ কালো টাকা সাদা করতে এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাব বজায় রাখতে তিনি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি বড় টেন্ডারে বেনামি শেয়ার বা অংশীদারিত্ব রাখছেন।


স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য সনির এই আকস্মিক উত্থান ও আড়ালে থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালানো নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছড়ারপার এলাকার এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, "কয়েক বছর আগেও এই ছেলেটা এখানে সাধারণ একটা চাকরি করতো। বিয়ের পর শ্বশুরের লাইনে ঢুকে আজ সে কোটি কোটি টাকার মালিক।

সে নিজে কখনো সামনে আসে না, সবকিছু আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। রাতারাতি এত বড় ডুপ্লেক্স বাড়ি কীভাবে বানালো, সেটা প্রশাসনের খতিয়ে দেখা উচিত।"সীমান্তবর্তী এলাকার এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সনি নিজে সামনে আসে না, কিন্তু ওর সিন্ডিকেটের কারণে জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে মাদকের জোয়ার বইছে। আবার হরিপুর আর গোয়াইনঘাটের দিকে টাকার জোরে ভুয়া অকশন পেপার বানিয়ে ট্রাকের ট্রাক ভারতীয় জিরা আর ভুঙ্গার মাল পাচার করছে ওরা। এদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারও নেই।


স্থানীয় সচেতন মহল জকিগঞ্জ, হরিপুর ও গোয়াইনঘাট সীমান্ত, কালিঘাট সিন্ডিকেট এবং সনির এই অবৈধ অর্থায়নে গড়ে ওঠা মাদক সাম্রাজ্য ধ্বংস করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত দাবি করেছেন।


সিলেট প্রেস / এফ কে


কমেন্ট বক্স
নিজস্ব প্রতিবেদক:

নিজস্ব প্রতিবেদক:

প্রকাশ: ২০২৬-০৬-২৭ ০৫:৩৭:৪৩