সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার ৩ নং বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদে কৃষি কার্ডের সরকারি চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও ওজনে কম দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী প্রতি কার্ডধারীকে ১৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা থাকলেও দরিদ্র ও অসহায় কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে মাত্র ১২ থেকে ১৩ কেজি। ওজনে এই চরম কারচুপির নেপথ্যে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টুর কাকাতো ভাই ও কথিত পিএস জুয়েল চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী কৃষকদের সূত্রে জানা যায়, কৃষি কার্ডের দ্বিতীয় কিস্তির ৩,০০০ টাকা এবং ১৫ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা থাকলেও বিতরণের সময় ওজনে চরম কারচুপির শিকার হচ্ছেন তারা। চাল কম দেওয়ার প্রতিবাদ করলে সাধারণ কৃষকদের নানাভাবে হয়রানি ও হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বুধবার দুপুর ১২টার পর যখন এই চাল বিতরণ কার্যক্রম চলছিল, তখন সরেজমিনে ভুক্তভোগী কৃষকরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জুয়েল চৌধুরী তাদের ১৫ কেজির জায়গায় মাত্র ১২ থেকে ১৩ কেজি করে চাল দিয়েছেন। অনেক কৃষক চালের পরিমাণ দেখে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং পরিষদ ভবনের বাইরে গিয়ে পুনরায় মেপে দেখেন যে, বস্তায় চালের পরিমাণ ২ থেকে ৩ কেজি করে কম। সরকারি নির্দেশ অমান্য করে শত শত অসহায় কৃষকের হক এভাবে কেড়ে নেওয়ায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
স্থানীয়রা জানান, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে চেয়ারম্যানের ভাই জুয়েল চৌধুরীর নেতৃত্বেই মূলত এই চাল বিতরণ কার্যক্রম চলছিল। বিতরণকালে সেখানে ইউপি সদস্য (মেম্বার) মো. আলমাছ মিয়া ও মাতব্বর মেম্বারসহ স্থানীয় কৃষকরা উপস্থিত ছিলেন।
এলাকাবাসীর দাবি, জুয়েল চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যানের পিএস পরিচয় দিয়ে নানা ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম করে আসছিল। তার এই সীমাহীন দুর্নীতি, গ্রামীণ ও ভিজিডি-ভিজিএফের অর্থ আত্মসাৎ এবং বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ তছরুপের বিরুদ্ধে কিছু দিন আগেই সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ আদালতে একটি লিখিত অভিযোগ ও মামলা দায়ের করেন ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সহদেব চন্দ্র দাস এবং ৯ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আলমাছ মিয়া।
উক্ত মামলায় বাহাড়া ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টু ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা সমীরন চন্দ্র সরকার এবং সংরক্ষিত ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের নারী সদস্য বাসন্তী রানী দাসকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলায় উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্তরা যোগসাজশ করে বিভিন্ন ভুয়া ও জাল-জালিয়াতি প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন এবং জুয়েল চৌধুরীকে প্যানেল ও পিএস বানিয়ে পুরো ইউনিয়নে একচ্ছত্র আধিপত্য ও ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।
আদালতে মামলা থাকা এবং পূর্বে মেম্বারদের সাথে এমন প্রকাশ্য বিরোধ থাকার পরেও, গতকাল আবারও মেম্বার আলমাছ মিয়া ও এলাকার কৃষকদের উপস্থিতিতেই খোদ পরিষদ কার্যালয়ে বসে চাল কম দেওয়ার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে জুয়েল। এই ঘটনায় হতবাক হয়েছেন স্থানীয়রা। এলাকার সাধারণ মানুষের মনে তীব্র প্রশ্ন—আদালতে ও জেলা প্রশাসকের দপ্তরে এত বড় দুর্নীতির অভিযোগ হওয়ার পরেও এই বিতর্কিত ব্যক্তি কীভাবে ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে এখনো আধিপত্য বিস্তার করে এবং প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারি চাল চুরির সাহস পায়?
এ বিষয়ে অভিযুক্ত জুয়েল চৌধুরীর কাছে জানতে চাওয়া হলে সে ওজনে কম দেওয়ার দায় এড়িয়ে চাল বিতরণের মূল দায়িত্ব গ্রাম পুলিশের ওপর চাপিয়ে বলে, এখানে গ্রাম পুলিশ দায়িত্বে আছে, আমি শুধু টিকিট রাখি। ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে তার অবস্থানের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সে কিছুটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলে, চেয়ারম্যান যদি আমারে কয়, তাহলে এখান থেকে যাইমু। অন্য কারও কথায় আমি এই office (অফিস) থেকে যাইতাম না।
এ বিষয়ে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বলেন, চাল কম দেওয়ার বিষয়টি আলমাছ মেম্বার আমাকে জানিয়েছেন। সরকারি চাল বিতরণে কোনো ধরনের ওজনে কম দেওয়া বা দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না। আমি পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছি এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




















